গৌতম সরকার
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
যোগমায়া দেবী কলেজ

শহর থেকে অনেক দূরে এক আধা পরিত্যক্ত গ্রাম। এই গ্রামে বেঁচে থাকা কিছু মানুষের দিন কাটে আশা-হতাশার ট্যাঙ্গো নাচে। ভগ্নস্বপ্নের মানুষগুলি ইরিমিয়াস নামের এক ব্যক্তির অপেক্ষায় থাকে। ইরিমিয়াস মানুষগুলিকে প্রতিশ্রুতি দেয়, সবাইকে এই পচনশীল গ্রাম থেকে মুক্ত করে নতুন জীবনের সন্ধান দেবে।
ইরিমিয়াস কে? গ্রামবাসী এতদিন তাকে মৃত বলে জানত। এখন সে ফিরে এসেছে। এই রহস্যময় ব্যক্তিটি সত্যিই কি ওই মানুষগুলির ত্রাণকর্তা, নাকি আর এক ধ্বংসদূত! সরল মানুষগুলি ইরিমিয়াসের ওপর বিশ্বাসে জমিজায়গা বিক্রি করে দেয়। তাদের বিষণ্ণ ও মেদুর চোখে নবসূর্যোদয়ের স্বপ্ন ভাসে। কিন্তু অন্তিমে দেখা যায়, মানুষগুলি ফের একটি প্রতারণার শিকার হয়েছে। ভাগ্য তাদের ঘুরে ফিরে ট্যাঙ্গো নাচের মুদ্রায় একই জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এক পা সামনে, দু’পা পিছনে। ফের সামনে। তারপর পিছনে। এক অনন্ত বৃত্তে মানুষগুলি নেচে চলে। নিজেদের ছায়াকে শয়তান ভেবে বিরামবিহীন নেচে চলে। এভাবেই বিচ্ছিন্ন, পতিত এক কৃষি সমবায় গ্রামের জীবনচিত্র উঠে এসেছে ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’ উপন্যাসে। লিখেছেন হাঙ্গেরির অন্যতম জনপ্রিয় লেখক লাজলো ক্রাসনাহোরকাই, যাঁকে সুইডিশ অ্যাকাডেমি এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দিয়েছে।
লাজলো ক্রাসনাহোরকাই আধুনিক হাঙ্গেরীয় সাহিত্যে একজন অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। তাঁর রচনাকে অনেক সমালোচক দুর্বোধ্য আখ্যা দিলেও পোস্ট মডার্ন সাহিত্যকর্মের অন্যতম উদাহরণ হিসাবে তা বিবেচিত হয়। অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলার নির্মম লড়াইকে স্বপ্নময় দৃশ্য ও উদ্ভট চরিত্রায়নের মধ্য দিয়ে উপস্থাপন ক্রাসনাহোরকাইয়ের রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর শিল্পকর্ম মহাপ্রলয়ের আতঙ্কের মধ্যেও শিল্পের শক্তি ও সুষমাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।’
ক্রাসনাহোরকাই মোট পাঁচটি উপন্যাস লিখেছেন। প্রথম উপন্যাস স্যাটানট্যাঙ্গো ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি পুরোপুরিভাবে লেখক জীবনকে বেছে নেন। এই উপন্যাস অবলম্বনে তাঁরই দেশের বরেণ্য চিত্র পরিচালক বেলা সাত ঘণ্টার একটি ছবি বানান। উপন্যাস এবং চলচ্চিত্র, দু’টিই দেশ এবং বিদেশে আলোড়ন ফেলে। তারপর থেকে ক্রাসনাহোরকাই সামাজিক প্রলয়ধর্মী মহাকাব্যিক লেখায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর কলম থেকে পরপর বেরিয়ে আসতে থাকে বিখ্যাত উপন্যাস মেলাঙ্কলি অব রেজিস্ট্যান্স (১৯৮৯), ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার (১৯৯৯), ব্যারন ভেনকহাইম’স হোমকামিং (২০১৬) এবং হারস্ট্ ০৭৭৬৯ (২০২১)। সব ক’টি লেখাতেই অরাজকতা, অবিশ্বাস, ধ্বংস, সহিংসতার প্রেক্ষাপটে সামাজিক ভাঙন ও অস্তিত্বের বিপন্নতা কীভাবে মানুষের জীবনে চরম হতাশা ডেকে আনে, তার বর্ণনা রয়েছে। তাঁর লেখার অন্যতম মূল প্রেক্ষিতই হল সামাজিক অবক্ষয়, যা তিনি জীবনের জটিলতা এবং মানব অস্তিত্বের অন্ধকার দিকগুলির পরম অন্বেষণে কাব্যময় ও শ্লেষাত্মক বাক্যবন্ধনীতে প্রকাশ করেছেন।
১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে রোমানিয়া সীমান্তবর্তী একটি ছোট শহর গিউলায় ক্রাসনাহোরকাই জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবের নিস্তরঙ্গ ওই জনপদই তাঁর স্যাটানট্যাঙ্গো উপন্যাসের প্রেক্ষাপট হয়ে উঠে এসেছে। নিজভূমের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিঃসঙ্গতা এবং পূর্ব এশিয়া সফরের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে৷ পূর্ব এশিয়ার চিন-জাপান সফরের পর তাঁর লেখার ভঙ্গি আরও গভীর ও কাব্যময় হয়ে ওঠে। সফর সেরে ফিরে কিয়োটোর এক গোপন বাগানের অন্বেষণকে প্রেক্ষিত করে ২০০৩ সালে লিখে ফেলেন এক কাব্যসুষমামণ্ডিত গদ্য, ‘আ মাউন্টেন টু দ্য নর্থ, আ লেক টু দ্য সাউথ, পাথস টু দ্য ওয়েস্ট, আ রিভার টু দ্য ইস্ট’। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘মেলাঙ্কলি অব রেজিস্ট্যান্স’-এর প্রতিপাদ্য বিষয় হল, হাঙ্গেরির কাল্পনিক শহরে এক বিশাল হাঙ্গরের প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে মানুষের উন্মাদনা, চূড়ান্ত প্রশাসনিক অব্যবস্থা এবং একনায়কতন্ত্রের উত্থানের নগ্ন খণ্ডচিত্র।
পাঠকমহল ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ উপন্যাসটি নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। এই উপন্যাসটি লেখার আগে লেখক ইউরোপের বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করেন। উপন্যাসে যতিচিহ্ন ব্যতিরেকে দীর্ঘ বাক্যরীতি তাঁর সাহিত্যশৈলী নিয়ে পাঠককে ভাবায়। একদলের মতে, তাঁর গদ্যধারা গতানুগতিকতার গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে কাহিনির বিশৃঙ্খল প্রবাহকে সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিফলিত করে। অন্য দলের মতে, একটি অনুচ্ছেদকে কোনওরকম যতিচিহ্ন ছাড়া পাতার পর পাতা বিস্তৃত করে কাহিনিকে অকারণে দুরূহ ও জটিল করে পাঠকদের ধৈর্যের পরীক্ষায় ফেলেছেন ক্রাসনাহোরকাই।
এই উপন্যাসের নায়ক ইয়াঙ্কো একটি মূল্যবান পাণ্ডুলিপি রক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ছুটে বেড়ায়। গোটা উপন্যাস জুড়ে চূড়ান্ত ধ্বংসের যে কাব্যিক বর্ণনা লেখক তুলে ধরেছেন, সেটা নোবেল কমিটিকে মুগ্ধ করেছে। তাদের বক্তব্য, ‘বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস ও অনিশ্চয়তার আবহে অভিনব সৃজনশীলতায় শিল্পের শক্তিকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন ক্রাসনাহোরকাই।’ কিছু বিরুদ্ধ সমালোচনা থাকলেও সারাবিশ্বে তাঁর পাঠক ও গুণমুগ্ধের সংখ্যা অগণিত। বিখ্যাত মার্কিন সাহিত্য সমালোচক সুসান সোনট্যাগ লাজলোকে সমকালীন সাহিত্যের ‘অ্যাপোক্যালিপসের মাস্টার’ বা ‘প্রলয়ের গুরু’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে নোবেল কমিটি সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত ২০০৮ সালে প্রকাশিত ‘হারস্ট্ ০৭৭৬৯’ উপন্যাসটি নিয়ে। তাদের মতে, এটি একটি দুর্দান্ত সমসাময়িক ইউরোপীয় উপন্যাস, যেখানে সমাজতান্ত্রিক হাঙ্গেরির সামাজিক অস্থিরতা ও সামাজিক ভাঙনের ছবি ভাষার অনুপম চাতুর্যে ফুটে উঠেছে। লেখক এই উপন্যাসে সমাজ ও ব্যক্তিসত্তার টানাপোড়েনকে অতীব দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
লাজলো ক্রাসনাহোরকাই মধ্য ইউরোপীয় পরম্পরার একজন মহাকাব্যিক লেখক। তাঁর সাহিত্য নির্মমভাবে অযৌক্তিক, একইসঙ্গে কাব্যিক উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে সেই সমস্ত লেখায় বিশৃঙ্খলার আকর্ষণ ও শিল্পের সুষমা একত্রে উদ্ভাসিত হয়েছে। সাহিত্য বিশ্লেষকরা তাঁকে আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্যে ফ্রানৎস কাফকার প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। কাফকা ছাড়াও তাঁকে মহান সাহিত্যিক থমাস বার্নহার্ড এবং স্যামুয়েল বেকেটের সঙ্গেও তুলনা করা হয়। সমালোচকদের আনা কঠিন চ্যালেঞ্জের সামনে শান্ত লাজলো নিজের শৈলীকে ‘পাগলামির সীমা পর্যন্ত বাস্তবতার পরীক্ষা’ বলে বর্ণনা করেছেন। একটি বাক্যে নোবেল বিজয়ী লাজলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের সৃষ্টিকে ‘কাফকার দুঃস্বপ্ন আর বেকেটের শূন্যতার মাঝে এক দীর্ঘ নৃত্য’ বলা যায়।
