শ্রীমন্ত পাঁজা

মাঝেমধ্যেই নিম্নচাপের ভ্রুকুটি বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল পরিবারের ছোট সদস্য অর্ধেন্দু, শীর্ষেন্দু, স্বর্ণেন্দু, দিশা, শ্রেয়া ও সংকলনের মনে। কারণ পরিবারের বড় সদস্যদের চেয়েও দ্বিগুণ আনন্দে মেতে ওঠে হাওড়া জেলার পাঁচলা ব্লকের গঙ্গাধরপুর গ্রামের বোধক পরিবারের ছোটরা। শারদ উৎসবের মরশুমে ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী অন্তিম পুজো রাস উৎসব। রাস উৎসবের ক’দিন যাতে বৃষ্টি না হয়, সেজন্য ছোটরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিল এবং সে প্রার্থনা মঞ্জুর করেছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।
বোধক পরিবারের বর্তমান রাসপুজোর অন্যতম কর্মকর্তা বনমালী বোধক জানান তাঁদের বংশপরম্পরা ঐতিহ্যবাহী এই পুজোর বিষয়ে। প্রায় ৬৪ বছর আগে সাত বছরের ছোট্ট বালক বুলাই বোধক বাঁশ, নারকেল পাতা, তালপাতা, মানপাতা, চটের থলে ও দড়ির দিয়ে মণ্ডপ বেঁধে রাসপুজো করার উদ্যোগ নেয়। এই উদ্যোগে শামিল হন তার বাবা পঞ্চানন বোধক ও মা বেদানাবালা বোধক। তখন গঙ্গাধরপুর গ্রামে ছোটদের মধ্যে রাসপুজোর ব্যাপক প্রচলন ছিল। তবে অধিকাংশ পুজো বর্তমানে প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ছোটদের হাতে তৈরি মণ্ডপের মধ্যেই রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তি বসিয়ে পুজো আরাধনা করতেন সেদিনের সেই ছোট্ট বালক বুলাই বোধক। টর্চের ব্যাটারি, তার ও টুনি বালবের সাহায্যে ঠাকুর মণ্ডপ আলোকসজ্জায় সজ্জিত করে তুলত। কালকক্রমে পুরোনো এই ধারার পরিবর্তন হয়ে ডেকোরেটরের কারিগর দিয়ে তৈরি মণ্ডপ ও জেনারেটরের সাহায্যে আলোকমালা সুসজ্জিত করা হয়।
হতদরিদ্র পঞ্চানন সারা বছর অর্থ জোগাড় করে বেশ কয়েক বছর ধরে রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তির পাশাপাশি মাটির তৈরি অষ্টসখী, বকাসুর বধ, তাড়কাসুর বধ, বাল্মিকীর তপোবন, বাসুদেবের মাথায় চড়ে কৃষ্ণের মথুরা গমন ছাড়াও আরও নানা ধরনের রাস মণ্ডপ সাজিয়ে গাঁদা ফুল ও মোরগ ফুলের বাগান অপরূপ সুসজ্জিত করে রাসপুজো করতেন। প্রয়াত পঞ্চানন, বুলাই এবং বেদানাবালার হাতে তৈরি রাসপুজোর ধারা বংশপরম্পরায় এখনও ধরে রেখেছেন বর্তমান প্রজন্মের বনমালী।
চার দিন ধরে এই রাস উৎসব পালিত হয়। পরিবারের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী ছাড়াও পার্শ্ববর্তী গ্রামের বহু মানুষ ঐতিহ্যবাহী এই রাস উৎসবে শামিল হন। গঙ্গাধরপুর শিক্ষা হাবের প্রতিষ্ঠাতা সন্তোষকুমার দাস ছাড়াও স্থানীয় গঙ্গাধরপুর বালিকা বিদ্যামন্দিরের প্রাক্তন ও বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা মমতা গুহঠাকুরতা ও শিপ্রা দাসের উপস্থিতিতে রাস উৎসব এক অন্য মাত্রা লাভ করে। আমন্ত্রিত অতিথিদের ভোগ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়।
বনমালী বোধক আক্ষেপের সুরে জানান, বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে ৬৫ বছর ধরে বোধক পরিবারের ঐতিহ্যবাহী এই রাস উৎসব ধরে রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ তাঁর পরিবারের কাছে।
