প্রদীপ মারিক
সাগরদ্বীপ পৌরাণিক এবং ঐতিহাসিক দিক থেকে পুণ্যার্থীদের কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমন ভ্রমণ পিপাসুদের কাছেও প্রাণের স্পন্দন। পৌরাণিক উপাখ্যান থেকে আমরা কমবেশি সবাই জানি, কেন মা গঙ্গা এই সাগরকেই বেছে নিলেন তাঁর পবিত্র স্রোতস্বিনী রূপকে মোহনায় বিলীন করতে। তাই গঙ্গাসাগরে কেউ যদি একবার আসেন, তিনি যদি সত্যিই অন্তর থেকে প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, তাহলে তাঁকে অন্তত একসপ্তাহ এখানে থেকে যেতে হবে। মনে হবে না মোবাইল ফোন, টিভি দেখি। মনে হবে শুধু চেয়ে থাকি অনাবিল প্রকৃতির দিকে। কী সৌন্দর্য! কী অপরূপ মেঘবালিকার দল!
দুর্গাপুজোয় সাগরদ্বীপ সেজে ওঠে আন্তরিক সাবেকিয়ানা এবং বনেদিয়ানায়। সাগর শিল্পী পরিমল মাইতি তাঁর শিল্পকলায় ফুটিয়ে তোলেন সাগরদ্বীপের দুর্গামণ্ডপগুলি। পরিমল মাইতির জন্ম সাগরদ্বীপেই। তিনি ২৫-৩০ বছর এই পেশায় নিযুক্ত। তিনি ঠাকুর গড়ার কাজ যখন শুরু করেন, তখন ৭ টাকা রোজ পেতেন। সুদূর কালীঘাট থেকে বিচুলি এনে সাগরদ্বীপে তিনি মূর্তি তৈরি করতেন। তিনি কুমারটুলির সুদীপ পালের কাছে কাজ থেকে প্রতিমা তৈরির কাজ শিখেছেন। কেবল মৃৎশিল্পী হিসাবে নয়, তাঁর শিল্পকর্মের খ্যাতি সাগরদ্বীপ, কাকদ্বীপ, নামখানা ছাড়িয়ে সুদূর কলকাতা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে।
পরিমল মাইতি মনে করেন, এ কাজের জন্য গুরু রবিন দাসের কাছে তিনি কৃতজ্ঞ। সাগরে প্রথম থিম পুজো শুরু হয়েছিল পরিমলের হাত ধরে। সাগরে মিনি মার্কেট কালীপুজোয় পরিমলের হাতে তৈরি হয়েছে গাইসালের ট্রেন দুর্ঘটনা। আহল্যা ক্লাবের দুর্গাপূজায় গড়েন বাংলাদেশের যমুনা ব্রিজ। তারপর একটির পর একটি থিম পুজো ছড়িয়ে গেল সাগরদ্বীপে তাঁর হাত ধরেই। ওড়িশার বন্যার থিম করেন বিশ্বকর্মা পূজায়। চিত্ত মোড় বাজার, সাগরদ্বীপে বাসন্তী পুজোর থিম ছিল আন্দামানের সুনামি। করমণ্ডল ট্রেন দুর্ঘটনা ফুটিয়ে তোলেন কচুবেড়িয়ার জয়গুরু আশ্রম মোড়ের দুর্গাপুজোয়। বিশ্বকর্মা পূজায় সাগরের বামনখালিতে শিল্পী ফুটিয়ে তোলেন কেরালার বন্যা— এক প্রসব যন্ত্রণায় কাতর মহিলাকে উদ্ধার করে সেবাহিনীর হেলিকপ্টার এবং সেই মহিলা হাসপাতালে গিয়ে সন্তান প্রসব করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনী যে কত তৎপর, সে কথাই শিল্পী তাঁর শিল্পকলায় ফুটিয়ে তুলেছেন। পরিমল ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর শিল্পকলায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এবং পেন্টাগন। তিনি পেয়েছেন একাধিক শারদ সম্মান। তবে তিনি শারদ সম্মানের চেয়েও নিজের শিল্পকর্ম সাগরবাসীর কাছে পৌঁছে দিতে বেশি আগ্রহী। শহর ও শহরতলির দুর্গাপুজোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না গিয়েও আন্তরিকতায় সাগরদ্বীপের দুর্গাপুজো আপামর বঙ্গবাসীর নজর কাড়ে, এ কথা বর্তমান সাগরদ্বীপবাসী হিসাবে আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি। এ বছরও সাগরদ্বীপের দুর্গাপুজো নজর কাড়ে দর্শনার্থীদের। উল্লেখযোগ্য পুজোগুলির মধ্যে রয়েছে, সাগরের কচুবেরিয়া বাসস্ট্যান্ড, জয়গুরু আশ্রম মোড়, মুড়িগঙ্গা শিলপাড়া দুর্গাপুজো, কোম্পানির ছাড় দুর্গাপুজো, বামনখালি দুর্গাপুজো, মন্দিরতলা চক ফুলডুবি, মহেন্দ্রগঞ্জ প্রাইমারি স্কুল মাঠ, চিত্ত মোড় দুর্গাপুজো কমিটি, হরিণবাড়ি, সাগর থানা দুর্গাপুজো, রুদ্রনগর অহল্যা ক্লাব, চৌরঙ্গী, দিগম্বরী, বাগবাজার, শ্রীধাম দুর্গাপুজো, কায়লাপাড়া দুর্গাপুজো, দক্ষিণ হারাধনপুরের সর্বজনীন পুজো প্রভৃতি। এছাড়াও হরিণবাড়ির দত্তদের বাড়ির পুজো ঐতিহ্যের নিশান হয়ে রয়েছে।
