রবিশঙ্কর চট্টোপাধ্যায়

মহালয়ার সঙ্গে দুর্গাপুজোর সরাসরি কোনও যোগ নেই। মহালয়ার দিন টিভি বা রেডিয়োয় আমরা যা দেখি বা শুনি, সেটা কিন্তু মহালয়া নয়, মহিষাসুর বধের অনুষ্ঠান, যা মহিষাসুরমর্দিনী বা মহিষাসুর বধ নামে পরিচিত।
মহালয়ার বুৎপত্তিগত অর্থ মহান আলয় অর্থাৎ প্রকাণ্ড এক গৃহ। সম্প্রতি বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে আমরা দেখছি, ‘সুপ্রভাত’-এর মতো অনেকেই ‘শুভ মহালয়া’ লিখতে শুরু করে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো যে, মহালয়াকে কখনও শুভ মহালয়া বলার কারণ নেই। পিতৃপক্ষের শেষ এবং মাতৃপক্ষ বা দেবীপক্ষের সূচনার মহাসন্ধিক্ষণ হল মহালয়া। মহালয়ার দু’টি অর্থ, পিতৃপক্ষের শেষ লগ্ন এবং দেবী পক্ষের সূচনা। পিতৃপক্ষ ও মাতৃপক্ষ সম্বন্ধে সম্যক ধারণা থাকাটা খুবই জরুরি। পিতৃপক্ষ হল গত হয়ে যাওয়া পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করার এক বিশেষ পক্ষ। বিষয়টি আরও খোলসা করে বলা যায় যে, যেসব পূর্বপুরুষ মারা গিয়েছেন, তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যার শেষ দিন জলদান করার প্রক্রিয়া। পরের দিন প্রতিপদ বা দেবীপক্ষের সূচনা হয়।
পিতৃপক্ষের প্রকৃত সময় জানতে গেলে আমাদের একটু অতীতে ফিরে যেতে হবে। মহাভারতে বলা আছে যে, মহাবীর কর্ণের মৃত্যুর পরে স্বর্গ প্রাপ্তি হলে তাঁকে খাদ্য হিসাবে স্বর্ণ ও রত্ন প্রদান করা হয়। বারবার জল চাইলেও তাঁকে একফোঁটা জল দেওয়া হয়নি। কর্ণ তাতে খুবই বিস্মিত হন। তখন দেবরাজ ইন্দ্র জানান যে, দাতা হিসাবে তাঁর কোনও তুলনা নেই। তিনি কখনও কাউকে খালি হাতে ফেরাননি। এমনকী যুদ্ধে যখন তিনি মৃতপ্রায়, সে মুহূর্তে স্বয়ং নারায়ণ ভিক্ষুক সেজে তাঁর কাছে দান চেয়েছিলেন। কর্ণ তাঁর সোনার দাঁত পর্যন্ত ভেঙে দান হিসাবে দিয়েছিলেন। তিনি চিরকাল প্রজাদের রত্ন ও স্বর্ণই প্রদান করে গিয়েছেন, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে কখনও অন্ন বা একফোঁটা জল প্রদান করেননি। বিস্মিত কর্ণ তখন লজ্জিত হয়ে বলেন, ‘হে মহারাজ, মর্তলোকে যখন আমার জন্ম হয়, তখন আমি জানতামই না যে, কে আমার পিতা আর কে আমার মাতা। তারপর যখন যুদ্ধক্ষেত্রে পদার্পণ করি, শেষ মুহূর্তে যুদ্ধের আগে মাতা কুন্তী আমাকে জানান, তিনিই আমার মা, আর যাদের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করতে যাচ্ছি, তারা আমার সহোদর ভ্রাতা এবং পরম আত্মীয়। ফলে পিতৃপরিচয় ও মাতৃপরিচয় যখন আমি পাই, তখন তাঁদের অন্নজল প্রদান করার কোনও সময় বা সুযোগ আমি পাইনি।’
ইন্দ্র দাতা কর্ণের কথায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বলেন যে, ‘ঠিক আছে, আপনি যেহেতু পিতৃপুরুষকে জল প্রদানের কোনও সুযোগই পাননি, তাই আপনাকে পনেরো দিনের জন্য মর্তলোকে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করা হল। আপনি যথাসময়ে শ্রদ্ধা সহকারে তর্পণ নিবেদনের পরে পুনরায় স্বর্গে আগমন করবেন।’ তারপর কর্ণ পৃথিবীতে ফিরে এসে প্রথমে একটি বিরাট ঘর বা আলয় নির্মাণ করেন। সেখানে পনেরো দিন ধরে তর্পণের উদ্দেশ্যে তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলি সম্পন্ন করেন এবং সে কাজ শেষ হয় আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের শেষ দিন। এই পনেরো দিন হল পিতৃপক্ষ। আর কৃষ্ণপক্ষের শেষ দিন হল মহালয়া। সেই থেকে এই দিনটি মহালয়া নামে খ্যাত। বিদেহী আত্মারা মহাসমারোহে তাঁদের উত্তরসূরিদের হাত থেকে জল গ্রহণের উদ্দেশ্যে একত্রে সমবেত হন বলে একে মহালয় বলে। আর দিনটি হল মহালয়া। মহাবীর কর্ণ যেদিন তর্পণের কাজটি শেষ করেছিলেন, কৃষ্ণপক্ষের সেই শেষ দিনই হল মহালয়া। আর এই পনেরো দিন সময়কালকে বলা হয় পিতৃপক্ষ। তার পরের দিন হয় প্রতিপদ এবং দেবীপক্ষের সূচনা। একসপ্তাহ পর শুরু হয় দুর্গাপুজো। ফলে শুভ মহালয়ার পরিবর্তে আমরা শুভ দেবীপক্ষের সূচনা লিখতে বা বলতে পারি। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে, মহাভারতের এ পর্বের অনেক আগে থেকেই মর্তলোকে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে অন্নজল প্রদান করার প্রথা চলে আসছে। এটা মনে করা হয় যে, পিতৃপুরুষরা এই অমাবস্যার দিন তাঁদের উত্তরসূরিদের হাত থেকে জল গ্রহণের জন্য মর্তলোকে মহাসমারোহে উপস্থিত হন। জল গ্রহণের পরে খুশি হয়ে তাঁরা স্বর্গলোকে ফিরে গেলে পরিবার সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠে। তাঁদের আশীর্বাদ বর্ষিত হয় পরিবারের সদস্যদের ওপর। সেই থেকেই আজও অতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহযোগে পুণ্যতোয়া গঙ্গাবক্ষে মানুষের ভিড়ে পালিত হয় তর্পণ।
এখন অনেকেই ভাবতে পারেন যে, মহালয়ার সঙ্গে দুর্গাপুজোর এমন সম্বন্ধ যুক্ত হল কীভাবে। এখানেও একটা সুন্দর ইতিহাস প্রচলিত রয়েছে। সেটি হল, আমরা জানি, শরৎকালে এই যে দুর্গাপুজো হয়, এটা কিন্তু আসল দুর্গাপুজো নয়, অকালবোধন। পুরাণে উল্লেখ রয়েছে যে, সুরত নামে এক রাজা বসন্তকালে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেছিলেন। বসন্তকালে দুর্গাপুজো হত বলেই এর অন্য নাম বাসন্তী পুজো। কিন্তু পরবর্তী সময় দশানন রাবণের হাত থেকে সীতাকে উদ্ধার করার আগে রামচন্দ্র তড়িঘড়ি অকালে দুর্গার পুজো করেছিলেন বলেই এর আর এক নাম অকালবোধন। যেহেতু কোনও মহৎ কাজে যাওয়ার আগে পিতৃপুরুষদের আশীর্বাদ লাভের জন্য তাঁদের জল অর্পণ করার প্রথা প্রচলিত, তাই এক্ষেত্রেও শ্রীরামচন্দ্র সীতাকে উদ্ধারের আগে পিতৃপুরুষদের তর্পণ করেছিলেন। কারণ পিতৃপুরুষদের আশীর্বাদ পাওয়া ছিল তার কাছে সবচেয়ে বেশি জরুরি। তাই তিনি দেবী দুর্গার অকালবোধনের আগে তর্পণ করেছিলেন আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যার দিন। তবে প্রাচীনকাল থেকেই এই তর্পণ অনুষ্ঠান যে শুধু ভারতেই চলে আসছে, তা নয়, প্রাচীন রোমানরা তাঁদের স্বর্গত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করতেন, যা ‘পারেন্তালিয়ান’ নামে প্রচলিত। টানা ন’দিন ধরে চলত সে অনুষ্ঠান। মেক্সিকোয় এখনও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে অল সোলস ডে পালিত হয় শুধু পূর্বপুরুষদের স্মৃতির উদ্দেশে। ফলে পূর্বপুরুষদের বিদেহী আত্মাকে শ্রদ্ধা জানানোর নামই হল মহালয়া।
