বিবেকানন্দ চট্টোপাধ্যায়
প্রধান শিক্ষক, চিত্তরঞ্জন হাইস্কুল, পুরুলিয়া

বিদ্যাসাগর তাঁর বর্ণপরিচয় (প্রথম ভাগ) গ্রন্থে দুই বিপরীত চরিত্রের বালক গোপাল এবং রাখালের কথা তুলে ধরেছেন। দুটোই গল্পের প্রয়োজনে শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে কাল্পনিক চরিত্র মাত্র। গোপাল সুবোধ শান্ত পড়াশোনায় মনোযোগী। অন্যদিকে রাখাল দুষ্টু, পড়াশোনায় অমনোযোগী।
বিদ্যাসাগর গোপালকে সুবোধ বালক বলেছেন ঠিকই, কিন্তু রাখালকে কুবোধসম্পন্ন বালক বলেননি। বর্তমানের টিভি অন্তর্জালের জমানায় বাল্যাবস্থাতেই কুবোধ জন্মাতে পারে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অপরিপক্ব কুবোধ যে কতখানি সর্বনাশা হতে পারে, তার নিদর্শন মিডিয়া অহরহ দিয়ে চলেছে। রাখাল নিশ্চিতভাবেই দুষ্টু ছিল, কিন্তু কোনও অর্থেই নোংরা ছিল না। দুষ্টুমি এবং নোংরামি কখনওই এক নয়। মদ-গাঁজায় আসক্তি, মারামারি করা, ঝুটঝামেলায় জড়িয়ে পড়া যার স্বভাববৈশিষ্ট্য, সেরকম কোনও বালক চরিত্র বিদ্যাসাগর তাঁর কোনও গ্রন্থেই তুলে ধরেননি। কারণ তদানীন্তন সময়ে এটা ছিল ভাবনারও অতীত।
কুবোধসম্পন্ন বালকরা যে মেধাবী হয় না, এটা সব সময় বলা যাবে না। সমাজের প্রথম সারির ছাত্রছাত্রীরা আজ ডাক্তারি শিক্ষার প্রতি অনুরক্ত। তাঁদের মধ্যে অবশ্যই কুবোধসম্পন্ন মেধাবীরাও থাকেন। না হলে হাসপাতালের মধ্যে এক ডাক্তারি শিক্ষার্থীর ধর্ষণ ও খুন সম্ভব হয় কীভাবে? একজন ড্রাগ আসক্ত মানুষ শক্তপোক্ত স্বাস্থ্যবতী কোনও যুবতীকে ধর্ষণ ও খুন করতে পারেন, এটাও বিশ্বাসযোগ্য? এটা যে মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়, তা আর একবার প্রমাণিত হল হালের আইন কলেজের ধর্ষণের ঘটনায়। নিপীড়িতা মেয়েটির বক্তব্য থেকে জানা গিয়েছে, কসবা কাণ্ডে অভিযুক্ত ছাত্রনেতাটি অন্য দুই ছাত্রের সাহচর্যে অপকর্মটি ঘটাতে সমর্থ হয়েছেন। আমরা ধর্ষিতাদের একটি করে নাম দিয়ে থাকি, যেমন, দিল্লির ঘটনায় ধর্ষিতার নাম ছিল নির্ভয়া, আরজি করে অভয়া। তবে কসবা কাণ্ডের ধর্ষিতার সৌভাগ্য যে, খুন হননি। এ ঘটনা নিয়ে রাজনীতির মুক্তাঙ্গনে মন্তব্যের রঙ্গতামাশা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে।
বাঙালি এত বেশি পলিটিক্যালি পোলারাইজড হয়ে পড়েছে যে, বানতলা, ধানতলা, সিঙ্গুর থেকে শুরু করে পার্ক স্ট্রিট, কামদুনি, হাঁসখালির ধর্ষণকাণ্ড নিয়েও দ্বিধা বিভক্ত! মজার বিষয় হল, রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের ঘরের মেয়েদের কিন্তু এমন দুর্ভাগ্যের শিকার হতে হয় না। অন্ততপক্ষে আজ পর্যন্ত এরকম খবর শুনিনি।
কয়েকদিন আগে The Hindu-তে প্রকাশিত আমেরিকা থেকে প্রচারিত একটি খবর শুনে একজন ভারতীয় হিসাবে ভিতরে ভিতরে বেশ আহত হলাম। মার্কিনীদের এরূপ বক্তব্যে আত্মমর্যাদায় ঘা লাগে, বিশেষ করে যখন অপারেশন সিঁদুরের সাফল্যসৃষ্ট জাতীয়তাবাদী আবেগ এখনও টাটকা, হৃদয় আবিষ্ট, সে সময় পাকিস্তানের ত্রাতা আমেরিকা আমাদের সম্পর্কে কটু মন্তব্য করলে আত্মশ্লাঘায় লাগারই কথা। আমেরিকান দূতাবাস থেকে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র-সহ ভারতের কতিপয় রাজ্য সন্ত্রাস ও ধর্ষণপ্রবণ। অতএব ভ্রমণ পিপাসু আমেরিকানদের এ সমস্ত রাজ্যে যেতে নিষেধ করা হচ্ছে বা ভ্রমণকালে সাতিশয় সাবধানতা অবলম্বন করার কথা বলা হচ্ছে। বাল্যকাল থেকে খরাপ্রবণ, বন্যাপ্রবণ মায় দুর্ঘটনাপ্রবণ শব্দ শুনে আসছি, কিন্তু ধর্ষণপ্রবণ এই প্রথম শুনলাম। আচ্ছা, বলুন তো, ধর্ষণ পৃথিবীর কোথায় হয় না? আমেরিকায় হয় না? আমরা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি, ষষ্ঠ শক্তিশালী সামরিক শক্তি, বৃহত্তম গণতন্ত্র, সর্বোচ্চ জনবহুল। এত কিছুতে এগিয়ে। তবু এরকমভাবে আমাদের সম্পর্কে কু-প্রজ্ঞাপন! আসলে প্রতিটি জাতির মনের কোনায় একটি মিথ্যা জাতীয়তাবাদী আবেগ থাকে, যা একটুখানি আহত হলেই সরবে বিস্ফারিত হয়। আর ভন্ড রাজনীতিবিদরা এই আহত জন-আবেগকে সুকৌশলে রাজনৈতিক ডিভিডেন্ট পাওয়ার লক্ষ্যে কাজে লাগিয়ে নেন। রবীন্দ্রনাথ এই ভন্ড জাতীয়তাবাদ (false vanity on nationalism) থেকে আমাদের সাবধান করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘নিজের প্রতি বা আপন জাতির প্রতি যে অন্ধ আনুগত্য বা ভালোবাসার বোধ, সে আত্মহত্যার নামান্তর। এই সজাত্য প্রীতি স্বদেশের মুক্তির পথ প্রশস্ত করে না।’ আমরা গড় ভারতীয় মুক্ত মানব হতে পারিনি, তাই আমাদের অন্ধ জাতীয়তাবাদ, ঠুনকো মর্যাদাবোধ, স্বজাত্য প্রীতি বিদেশিদের সঠিক সমালোচনায় আহত হয়। ঐতিহ্যগতভাবে ভারত এমন একটি দেশ, যেখানে মাতৃশক্তির আরাধনা করা হয়, লোকবরেণ্য নারীরা দেবীরূপে পূজিতা হন। ভাবতে অবাক লাগে, এরকম একটি দেশ, জাতি কতখানি অধঃপতিত হলে আমেরিকার মতো একটা উন্মার্গগামী, বিকৃত যৌনাচারের দেশ এরকম কথা বলতে পারে!
মহাজাগরণের অগ্রদূত স্বামীজি বলে গিয়েছেন, ‘হে ভারত, ভুলিও না, তোমার নারীজাতির আদর্শ সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তী, তোমার উপাস্য উমানাথ সর্বত্যাগী শঙ্কর।’ যারা এরূপ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটায়, তাদের আদর্শ কে, উপাস্য কারা? ধর্ষকরা বল পায় কোত্থেকে, কে জানে! আসলে তাদের মনোরাজ্যেই যত সমস্যা। তারা একজন নারীকে, মানবিক দৃষ্টিতে এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব, মেধা ও মননশীলতার আধার হিসাবে দেখতে পারে না, তাকে শুধুই এক মাংসাবয়ব, ভোগের উপকরণ হিসাবেই বিবেচনা করে। নিত্যনতুন শিকারের অপেক্ষায় তারা ওত পেতে থাকে।
কসবা কাণ্ডে যদি ডাক্তারি পরীক্ষা, পুলিশের রিপোর্ট সঠিকভাবে বিচার প্রক্রিয়ায় আসে, কায়েমি স্বার্থে কোনও কিছু গোপন না করা হয়, তাহলে অবশ্যই নির্যাতিতা সুবিচার পাবেন। তবুও আমরা এ বিষয়ে ১০০ শতাংশ নিঃসন্দেহ নই, কারণ অভয়ার মা-বাবা এখনও সুবিচারের আশায় অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছেন! সব মা-বাবাই চান, তাঁদের সন্তানের ওপর অত্যাচারের বিচার হোক।
