ভাস্কর সেনগুপ্ত

প্রতিটি মানুষ পঞ্চঋণ নিয়ে জন্মায়। এই ঋণ শোধ করাই মনুষ্য জীবনের কর্তব্য।
বেদ ঋণ বা ঋষি ঋণ: ঋষিরা জগতের যে রহস্য জানতে পেরেছেন, তা বেদে বিধৃত করেছেন। ব্যাসদেব সেই বেদকে আমাদের বোধগম্য করে বিন্যাস করেছেন। সে রহস্য পঠনপাঠন করলে এই ঋণ শোধ হবে।
দেব ঋণ: ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম দিয়ে এই জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। এই পঞ্চভূতের পিছনে যে দেবতা আছেন, তাঁকে শ্রদ্ধা, সম্মান, রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। যে এটা পালন করবে, সে প্রকৃতিকে দূষণ করতে পারবে না। জগৎ বাঁচবে।
নৃ-ঋণ: মানুষকে মানুষ সদ্ব্যবহার করবে। একজনকে দমন করে আর একজনের বৃদ্ধি নয়। যুদ্ধ, জমি দখল, অত্যাচার, উৎপীড়ন কখনও নয়।
ভূত ঋণ: পশুপক্ষী, জীবজন্তুকে রক্ষা করা।
পিতৃ-মাতৃঋণ: যে পিতা-মাতার জন্য আমরা খেয়ে পরে বেঁচে আছি, তাঁদের রক্ষণাবেক্ষণ আমাদের কর্তব্য।
আমাদের নিত্যকর্তব্য কী, তাতে বিশ্বের কী কল্যাণ, আশুসমস্যা সমাধানে সেটা কতটা সহায়ক, ব্যাসদেব তা বলে গিয়েছেন।
ঋষিরা বলে গিয়েছেন, প্রত্যেকদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কী কী কাজ করতে হবে। কী নিত্যকৃত্য পালন করলে চিত্তে প্রশান্তি বিরাজ করবে ও বিশ্বকল্যাণ হবে। প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গের পর নিজের করদর্শন করে বলতে হবে, করাগ্রে বসতে লক্ষ্মী, করমূলে সরস্বতী, করমধ্যে তু গোবিন্দ, প্রভাতে করদর্শনম। অর্থাৎ ঈশ্বর দর্শনের জন্য স্বর্গ, মর্ত, পাতাল দৌড়তে হবে না। আমার হাতের মধ্যেই লক্ষ্মী, সরস্বতী ও গোবিন্দ বিরাজমান। ঈশ্বর আমার হাতেই আছেন। আমার হাতের দ্বারা কর্মের ফল আমি পাব। আমার বর্তমান, ভবিষ্যৎ, সব নিজের হাতেই আছে। আমাকে আমার কর্তব্যকর্ম করে যেতে হবে। হতাশা বর্জন করতে হবে। কাউকে দোষ না দিয়ে কাজ করে যেতে হবে।
শয্যাত্যাগ করে ভূমি স্পর্শ করার পূর্বেই বলতে হবে, সমুদ্র বসনে দেবী পর্বস্তন মণ্ডলে, বিষ্ণুপত্নি নমস্তুভ্যং পাদস্পর্শে ক্ষমস্য মে। অর্থাৎ যে ভূমিতে আমি পাদস্পর্শ করতে চলেছি, তা আমার আরাধ্য দেবী লক্ষ্মী, তাই প্রণাম করছি। আমার কোনও কর্ম যেন তাঁকে পীড়া না দেয়। এই ভূমিকে রক্ষা করা আমার প্রথম কর্তব্য, তাই প্রভাতে তাকে প্রণাম। এ ভাবনা যদি আধুনিক প্রযুক্তিতে থাকত, তাহলে আজকের বিশ্ব অন্য রূপ ধারণ করত। আজকের বৈজ্ঞানিক সমাজ ভীতসন্ত্রস্ত এই ভেবে যে, কীভাবে এ দুর্বার ভূ-কলুষ নাশ করা যায়।
তারপর সূর্যদর্শন ও প্রণাম। ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম। ধান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্। কী অবাক ঋষি প্রপত্তি! ভূমিকে কলুষিত করব না, এ সংকল্পের পরেই সূর্য প্রণাম। অর্থাৎ ভূমি থেকে শক্তি কর্ষণ না করে সৌরশক্তি কর্ষণ করো। প্রার্থনা, হে সূর্যদেব, জগতের কলুষতা নাশ করো। সৌরশক্তি ব্যবহারে পঞ্চভূতের কলুষতাবিহীন শক্তি লাভ করা যায়। বিশ্ব বহু ভ্রম অন্তে এ শিক্ষালাভ করেছে। আর্য ঋষিরা যোগের মাধ্যমে এ সত্য বহু পূর্বেই জেনেছিলেন।
তারপর স্নান পর্ব। স্নান করার পূর্বে বলতে হবে, ওঁ গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরী সরস্বতী। নর্মদে সিন্ধু কাবেরী জলেহস্মিন্ সন্নিধিং কুরু। স্নানের পূর্বে সকল নদীকে কৃতজ্ঞতা জানানো হচ্ছে। তারা না থাকলে এ জল পেতাম কোথায়! যার প্রতি নিত্য কৃতজ্ঞতা জানানো হবে, তাকে কলুষিত কখনও করতে পারবে না। আজ বিশ্বের নদী কলুষতা বৃহৎ সমস্যা। বহু আইনকানুন, পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে, তবু নদী কলুষতামুক্ত হচ্ছে না।
তারপর স্নানান্তে প্রার্থনা— দৃতে দৃংহ মা মিত্রস্য মা চক্ষুষা সর্বানি ভূতানি সমীক্ষন্তাম। মিত্রস্যাহং চক্ষুষা সর্বানি ভূতানি সমীক্ষে। মিত্রস্য চক্ষুষা সমীক্ষামহে।। অর্থাৎ হে ঈশ্বর, আমাকে এমন দৃঢ় করো, যাতে সকল প্রাণী আমাকে বন্ধুর চোখে দেখে। আমিও তাদের বন্ধুর চোখে দেখি। আমরা সকলেই যেন পরস্পরকে বন্ধুর চোখে দেখি। শেখানো হয়, শক্তি সঞ্চয় অপরকে দমনের নিমিত্ত নয়, সকলের বন্ধু হওয়ার উদ্দেশ্যে। এ শিক্ষা সনাতন ধর্মীয় মানুষের ধমনীতে বিদ্যমান। তাই ভারতীয়রা কখনওই অন্য জাতিকে নিজের অধীনে আনেনি। কখনওই অন্যের ভূখণ্ড দখল করেনি। অতি আধুনিক ইতিহাস বলে, ভারত বাংলাদেশ দখল করেও ছেড়ে দিয়ে এসেছে।
পরবর্তী প্রার্থনা— ঈশা বাস্য মিদং সর্বং যৎ কিঞ্চ জগত্যাং জগৎ। তেন তক্তেন ভুজ্ঞীথাঃ মা গৃধঃ কস্যাস্বিদ ধনম।। অর্থাৎ ব্রাহ্মাণ্ডে যা কিছু বস্তু আছে, তা ঈশ্বরের দ্বারা আচ্ছাদিত। উত্তমরূপে ত্যাগের সঙ্গে ভোগ করবে। কারও ধনে লোভ করবে না। জগৎ ভোগের জন্য। আবার জগৎ ত্যাগের জন্য। যে ত্যাগ করতে জানে, সে সঠিক ভোগ করতে জানে। ভোগ অর্থ আসক্তিশূন্য প্রেরণা। সনাতন ধর্মের মানুষকে এ শিক্ষাই দেওয়া হত। ব্যাসদেব এ শিক্ষাই আমাদের দিয়েছেন। গুরু পূর্ণিমা তখনই সার্থক হবে, যখন আমাদের জীবনে এগুলির সার্থক রূপায়ণ হবে।

Though the article is not a big zero; still I do not find it of great value because I find life a business inevitably running with loss. There are so much unbearable pains and agonies in life.