কাজল মুখার্জি

যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য আত্মনিবেদন করেন, তাঁরা সময়ের সীমার বাইরে গিয়ে ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে ওঠেন। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ঠিক তেমনই এক ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ, যুক্তিবাদী রাজনীতিবিদ এবং আপসহীন দেশপ্রেমিক। তাঁর চিন্তা ও আদর্শ আজকের ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সম্পূর্ণভাবে প্রাসঙ্গিক।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন ১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতার এক ঐতিহ্যবাহী শিক্ষিত পরিবারে। তাঁর পিতা স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায ছিলেন ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। শ্যামাপ্রসাদের শিক্ষা শুরু হয় কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে, যেখান থেকে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক হন।
তারপর আইন বিষয়ে পড়াশোনা করতে শ্যামাপ্রসাদ পাড়ি জমান লন্ডনে। ব্যারিস্টার হওয়ার পাশাপাশি তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ও রাজনৈতিক অর্থনীতিতে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন। বিদেশে পড়াশোনার সময়েও তাঁর মধ্যে ভারতীয় আত্মপরিচয়ের চেতনা আরও দৃঢ় হয়। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হয়ে সেখানে নতুন বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি, গবেষণার প্রসার এবং ছাত্রছাত্রীদের স্বাধীন চিন্তার চর্চায় উৎসাহিত করেন।
শ্যামাপ্রসাদ মনে করতেন, একটি জাতিকে জাগাতে হলে প্রথমে শিক্ষাকে জাগাতে হবে। তাঁর সময়ে তিনি মেয়েদের উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান গবেষণা এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নেন। তাঁর নেতৃত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাঙ্গনে পরিণত হয়।
ড. মুখোপাধ্যায় রাজনীতির ময়দানে পা রাখেন নীতির প্রশ্নে। ১৯৩৯ সালে তিনি কংগ্রেসের কার্যকলাপ থেকে নিজেকে সরিয়ে আনেন এবং হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল, ভারতের সামগ্রিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং সংখ্যালঘু তোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। তিনি ১৯৪১ সালে বাংলার গভর্নরের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য হন এবং দায়িত্ব পান শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিভাগের। তবে ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ শাসকদের ভারত ছাড়ো আন্দোলন দমন নীতির বিরোধিতা করে তিনি ইস্তফা দেন। তাঁর এই পদক্ষেপ তাঁকে একজন নীতিনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে।
ভারত বিভাজনের বিরুদ্ধে শ্যামাপ্রসাদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ ভবিষ্যতের একটি বিপদের বীজ বপন করবে। পরবর্তীতে কাশ্মীর ইস্যুতে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। জম্মু-কাশ্মীরকে দেওয়া ধারা ৩৭০ এবং দ্বৈত শাসনব্যবস্থার প্রবল বিরোধিতা করে তিনি জাতিকে সাবধান করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এমন একটি ভারত দেখতে চাই না, যেখানে দু’জন প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজন হবে, এক দিল্লির আর এক কাশ্মীরের।’ তার প্রতিবাদে তিনি ১৯৫৩ সালে কাশ্মীর যাত্রা করেন এবং সীমান্ত পার হওয়ার পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ২৩ জুন, ১৯৫৩ মাত্র ৫২ বছর বয়সে বন্দি অবস্থায় রহস্যজনকভাবে তাঁর মৃত্যু ঘটে, যার খোলসা আজও হয়নি। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সে দলের প্রতিষ্ঠাতা। সে দল পরবর্তীকালে ভারতীয় জনতা পার্টির আদর্শগত ভিত্তি রচনা করে। জনসংঘের মূলমন্ত্র ছিল, এক ভারত, এক সংবিধান, আত্মনির্ভর ভারত, রাষ্ট্রীয় সংহতি ও সাংস্কৃতিক ঐক্য।
ড. শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান, যুক্তিনিষ্ঠ এবং জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনার মানুষ। ব্যক্তিজীবনে ছিলেন সৎ, সরল এবং দৃঢ়চেতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের সঙ্গে বেইমানি করার চেয়ে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়া ভালো। তিনি ছিলেন ধর্মবিশ্বাসী, কিন্তু ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধী। হিন্দুদের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে যেমন সোচ্চার ছিলেন, তেমনই সব ধর্মাবলম্বীর স্বাধীনতা রক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতেন।
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন আমাদের শেখায়, একজন মানুষ কতটা দৃঢ়সংকল্প, আদর্শনিষ্ঠ এবং দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত হলে এককভাবে ইতিহাসের ধারা বদলাতে পারেন। ৬ জুলাই তাঁর জন্মদিন কেবল স্মরণ করার নয়, বরং আত্মনিবেদিত দেশসেবার প্রেরণা নেওয়ার।
আজ যখন আমরা জাতীয় ঐক্য, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন দেখি, তখন শ্যামাপ্রসাদের চিন্তা ও আদর্শ আমাদের অন্ধকারে পথ দেখায়। তিনি চলে গিয়েছেন, কিন্তু রেখে গিয়েছেন এমন এক আদর্শের বীজ, যা আজও উর্বর হয়ে উঠছে আমাদের মননে, রাজনীতিতে এবং রাষ্ট্রচিন্তায়।

I am perplexed. Every now and then so much I hear either for or against Shyama Prasad that perplexity is inevitable. Yet, I must admit that I hardly find any self-contradiction in this article. But it would have been excellent if the other side of his character had been mentioned. The author has used the word “kothor” about Shyama Prasad…..but did not mention how much “kothor” Shyama Prasad was.
কলকাতায় শ্যামাপ্রসাদের স্ট্যাচু কোথায় রয়েছে? শিলচরে রয়েছে বিশালকায় শ্যামাপ্রসাদ রোডে।