Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

নোবেল জয়ী মেরি কুরিও হয়েছিলেন সমাজের শিকার

Share Links:

কাজল মুখার্জি

‍‘আপনি নোবেল পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু দয়া করে পুরস্কার নিতে আসবেন না। এমন এক চরিত্রহীন নারী পুরস্কার নিতে এলে আমাদের সম্মান ক্ষুণ্ণ হবে। আমরা পুরস্কারটি আপনাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেব।’

১৯১১ সাল। সারা পৃথিবী বিস্মিত। দ্বিতীয়বার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেন মাদাম মেরি কুরি। তাও আবার ভিন্ন দু’টি বিভাগে, প্রথমবার পদার্থবিজ্ঞানে, এবার রসায়নে। বিজ্ঞান জগতে এক অভূতপূর্ব ইতিহাস রচিত হল। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গেই স্টকহোমের নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে এই লজ্জাকর অনুরোধ।

মেরি কুরি হতবাক। আট বছর আগে স্বামী পিয়ের কুরির সঙ্গে যৌথভাবে যখন প্রথমবার নোবেল পান, তখন অসুস্থতার কারণে কেউই যেতে পারেননি। এবার তিনি নিজেই যাবেন বলে জানালেন দৃঢ়, শান্ত স্বরে। কিন্তু নোবেল কমিটির  অনুরোধের পিছনে ছিল একটি নোংরা চক্রান্ত, মিডিয়া ও জনরুচির যৌথ তাণ্ডব। সংবাদপত্রে একের পর এক প্রকাশ পাচ্ছে মেরি কুরির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কল্পিত কেচ্ছা। তাঁর স্বামীর ছাত্র পদার্থবিদ পল লজেভঁ-র সঙ্গে প্রেম, পরকীয়া, এমনকী স্বামীর মৃত্যু নিয়ে ষড়যন্ত্রের অপবাদও। পলের প্রাক্তন স্ত্রী কিছু ব্যক্তিগত চিঠি ফাঁস করে দেন, আর সে চিঠিকে হাতিয়ার করে ফরাসি সংবাদমাধ্যম শুরু করে কুৎসার ঝড়। একে নারী, তার ওপর সফল, যিনি বৈজ্ঞানিক পরিসরে পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি পারদর্শী হয়ে উঠেছেন, অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন, তাঁকে সমাজ সহজে মেনে নেয় না। পোল্যান্ডে জন্ম, ফ্রান্সের ‘ভূমিজ’ নন, সে আক্রোশও লেগে থাকে পিছনে। একদিকে অস্বীকৃতি, অন্যদিকে হুমকি, গালিগালাজ, অপমান, নোবেল বিজয়ীর বাড়ির চারপাশে জড়ো হতে থাকে উত্তেজিত জনতা। যে মানুষটি দেশের সম্মান বয়ে এনেছেন, তাঁকেই ঘৃণার পাত্রে পরিণত করা হয়।

বিজ্ঞানী পল লজেভঁ এক পর্যায়ে সাংবাদিক গুস্তেভ টেরিকে ডুয়েল লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জ জানান, যে সাংবাদিক লিখেছিলেন, পিয়ের কুরি আত্মহত্যা করেছিলেন স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতায়। সে চ্যালেঞ্জে শেষ পর্যন্ত ডুয়েল হয়নি, কিন্তু ততদিনে জনরুচির লজ্জাহীন মুখোশ খুলে গিয়েছে।

তবে মেরি কুরি হার মানেননি। সন্তানদের নিয়ে মাথা উঁচু করে পৌঁছন স্টকহোমে। যাবতীয় কুৎসা ও হেনস্থাকে ছাপিয়ে সুইডেনের রাজার হাত থেকে দ্বিতীয় নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেন বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম মানুষ হিসাবে। বক্তৃতায় স্বামী পিয়েরের কথা বারবার স্মরণ করেন, তাঁদের যুগ্ম স্বপ্নপূরণের উদ্দেশ্যেই তাঁর এই লড়াই। কিন্তু ফরাসি সংবাদমাধ্যম সেদিনও নীরব ছিল এই গৌরবগাথায়। বরং কুৎসা, ট্রোল, গর্ভপাতের গুজব, সবই চলল সমান তালে। এমনকী মাদাম কুরি যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি, তখনও বলা হল, তিনি অবৈধ সন্তান গোপনে নষ্ট করাতে গিয়েছেন। বারবার মেরি কুরিকে কুকথায় ছিন্নভিন্ন করা হয়েছে, শুধু তাঁর নারী হওয়ার কারণে। তবু তিনি থেমে যাননি। রেডিয়াম ইন্সটিটিউটের পত্তন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৮টি মোবাইল এক্স-রে ইউনিট পরিচালনা এবং পরবর্তী জীবনে একাধিক দেশে বক্তৃতা ও গবেষণা, সবই চালিয়ে গিয়েছেন অসুস্থ শরীর নিয়ে। তার মধ্যেও সমাজ প্রশ্ন তোলে, ‍‘ভালো সাজতে চাইছেন?’

মেরি কুরি জানতেন, এক নারী যদি নিজের শক্তিতে সমাজের শিখরে পৌঁছয়, তবে সমাজ তাঁকে ভাঙতে উদ্যত হবেই। কিন্তু ইতিহাস অত নিষ্ঠুর নয়, সে শেষমেশ সত্যকেই জয়ী করে তোলে। বছরের পর বছর পর মেরির সম্মানই অমলিন রয়েছে, মিথ্যাচার মুছে গিয়েছে। আজ তাঁর নামেই প্রতিষ্ঠিত একাধিক গবেষণাকেন্দ্র। মেরি কুরির অবদানেই আধুনিক পারমাণবিক বিজ্ঞান।

এক আশ্চর্য ঘটনা ইতিহাসে থেকে যায়, মেরি কুরি ও পল লজেভঁ-র প্রেম পূর্ণতা পায়নি, কিন্তু তাঁদের নাতি-নাতনি মাইকেল ও হেলেন পরবর্তীকালে বিয়ে করে গড়েন এক সুখী পরিবার, যেন ইতিহাস নিজেই এক ক্ষতিপূরণ। ৪ জুলাই মাদাম কুরির মৃত্যুদিন। তাঁর ৯১তম মৃত্যুবার্ষিকীকে জানাই শ্রদ্ধা। তিনি শুধু একজন বিজ্ঞানী নয়, নারীশক্তির প্রতীক, অপমান ও গুজবের বিরুদ্ধে নির্ভীক প্রতিরোধ। আজকের দিনে দাঁড়িয়েও মনে করিয়ে দিতে হয়, ‍‘আপনার কাজগুলি ঠিক রয়ে যাবে, বাকি সব হারিয়ে যাবে।’

5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए