অজয় ভট্টাচার্য

স্বার্থতাড়িত আন্দোলনে রবি ঠাকুর কেন? সম্প্রতি চাকরিহারা শিক্ষকদের আন্দোলনে এক শিল্পী এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশ ধরে। সম্ভবত আন্দোলনকারী শিক্ষকরাই তাঁকে এনেছিলেন আন্দোলনে চমক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশ ধরে শিল্পী পুলিশকে গোলাপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন, অথচ পুলিশ নিচ্ছে না। এখন প্রশ্ন হল, এরকম একটি দৃশ্যে প্রতীকী অর্থে হলেও ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’-কে কাজে লাগানো কি খুব শোভনীয় হল?
বিশ্বব্যাপী যে বহু রবীন্দ্র অনুরাগী আছেন, তাঁরা কি এই ঘটনায় কিছুটা হলেও আহত হলেন না? ‘আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের দোলে দোলাও’-এর অর্থ এই নয় যে, তাঁকে আমরা যেখানে খুশি, যেমন খুশি ব্যবহার করতে পারি। আন্দোলনকারীদের প্রতি আমরা সকলেই সহানুভূতিশীল। তাঁদের কষ্টে আমরাও সমব্যথী। তাঁদের দাবিদাওয়া যথাযথ। কিন্তু এটা তো মানতে হবে যে, আর জি কর কাণ্ডের প্রতিবাদে চিকিৎসকদের আন্দোলন ছিল চিকিৎসা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে। তার মধ্যে একটি সার্বিক কল্যাণসাধনের স্বপ্ন ছিল। সেখানে শিক্ষকদের আন্দোলন হারানো চাকরি ফিরে পাওয়াকে কেন্দ্র করে। এর সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। কীভাবে পঠনপাঠন ব্যবস্থা আরও বেশি শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক করে তোলা যায়, তারও কোনও সুপারিশ দাবিদাওয়াগুলির মধ্যে নেই। এমনকী যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে, তাও সার্বিক নয়। শুধু ২০১৬ সালের এসএসসি-র শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে যে দুর্নীতি হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে। তাই ক্ষুদ্র স্বার্থতাড়িত আন্দোলনের পাকচক্রে মনীষীদের না জড়ানোই ভালো।
প্রতীকী শিরদাঁড়া, প্রতীকী চোখ, মস্তিষ্কের প্রতিকৃতি অথবা ‘লেডি অব জাস্টিস’-এর মূর্তি নিয়ে জুনিয়র চিকিৎসকদের ‘স্বাস্থ্যভবন সাফাই অভিযান’ ছিল প্রতিবাদী আন্দোলনে এক নতুন সংস্কৃতির ঢেউ। সেখানে প্রতীকী শিরদাঁড়া, প্রতীকী চোখ, মস্তিষ্কের প্রতিকৃতির তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ব্যবহার মানুষের নজর কেড়েছিল। কারণ প্রতিটি উপাদান ছিল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং অর্থবহ। তাই একে অনুসরণ করতে গিয়ে বিপথে চালিত হওয়া ঠিক নয়। প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ে জাতীয় সংগীত অবমাননা মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের কথা। এই মামলায় বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত জানিয়েছিলেন, ‘জাতীয় সংগীতের জন্য শিষ্টাচার মেনে চলা উচিত। হঠাৎ করে জাতীয় সংগীত শুরু করা যায় না। পরিবেশ-পরিস্থিতির কথাও মাথায় রাখা উচিত ।’ জাতীয় সংগীত যেমন আমাদের মধ্যে আবেগ ও দেশপ্রেমের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, তেমনই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের জাতীয় আবেগ এবং সংস্কৃতির প্রতীক। তাই প্রতীকী অর্থে হলেও ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’-কে ব্যবহারের আগে সতর্ক হওয়া উচিত।
