ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
সিনিয়র প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ে যুগ-যুগান্তরব্যাপী তর্ক অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত। আমাদের প্রাচীন দর্শন শাস্ত্রগুলিও এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে ব্যর্থ। ষড়দর্শনের অন্তর্গত সাংখ্য দর্শন ও মীমাংসা দর্শন (পূর্ব ও উত্তর) ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিরোধী। আবার ন্যায়, যোগ, বৈশেষিক দর্শন ঈশ্বরের ঘোষিত অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত করার পক্ষে সরব। এ বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়নি বলেই বাংলা লোকপ্রবাদে বলা হয়, ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।’ পথ অনেক, মেলানোর চেষ্টাও অন্তহীন, যা এদেশের প্রাচীন মুনি-ঋষিদের দার্শনিক পন্থার ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসাবে সমগ্র জগতে মান্যতা লাভ করে থাকে।
এ মহাবিশ্বের তাবৎ বুদ্ধিজীবীরাও এ বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত। উদাহরণের তালিকা এত দীর্ঘ যে, তা উল্লেখ করতে গেলে বিষয়ের বিচিত্রতা থেকে আমাদের দূরে সরে যেতে হবে। প্রসঙ্গত, ঈশ্বর বিশ্বাসের সঙ্গে আধ্যাত্মিক অনুষঙ্গ বিজড়িত। কিন্তু প্রাচীন যুগ থেকে অদ্যাবধি দেশ-দেশান্তরে এর সঙ্গে ধর্মানুশীলনকে যুক্ত করায় তা পৃথক একটি মার্গের সৃষ্টি করেছে, যা পরিপূর্ণ রূপে আধ্যাত্মিকতার বিপ্রতীপ অবস্থান গ্রহণ করে। আসলে ধর্ম হল, ‘A Way of living’, যা দেশ, কাল, সমাজে ভিন্নতর দ্যোতনায় উদ্ভাসিত।
ভারতে শত-সহস্র বৎসরব্যাপী প্রচলিত হিন্দু ধর্ম বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মবিশ্বাস হিসাবে স্বীকৃত। নির্দিষ্ট কোনও প্রতিষ্ঠাতা ব্যতীতই এ ধর্ম তার শিকড় ছড়িয়েছে সমাজের বহু গভীরে। বিতর্ক সত্ত্বেও অদ্যাবধি ভারত একটি আধ্যাত্মিক দেশ রূপে জগতের কাছে সমাদৃত। বৈচিত্রময় ভৌগোলিক পরিবেশ এ দেশের জন্য একটি স্বতন্ত্র জীবনধারাকে যুগ যুগ ধরে লালন-পালন করেছে। বিরোধী মত ও পথ বিভিন্ন সময় এ বৈচিত্রময়তাকে লঘু করার জন্য উদ্যত হলেও শেষমেশ হার মেনেছে। একটি উদাহরণ এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর জৈন এবং গোশাল মংখলিপুত্ত যথাক্রমে, বৌদ্ধ, জৈন এবং আজীবিক ধর্মদর্শনের কথা প্রচার করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কফিনে শেষ পেরেকটি প্রোথিত করা। দলে দলে, কাতারে কাতারে মানুষ একবগ্গা প্রচারে আকৃষ্ট হয়ে ওই প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলনে শামিল হয়েছিল। কিছু সময়ের জন্য ওই তিন ধর্মের পতাকা ভারত ও সংলগ্ন অঞ্চলে জনগণের আরাধ্য হয়েছিল। কালের প্রবাহে এই ধর্মগুলি হিন্দু ধর্মের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। পূজা পদ্ধতি, রীতিনীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে এগুলি জনপ্রিয় হয়েছিল। কালক্রমে এই ধর্মের মধ্যেও অনুরূপ প্রকরণ চালু হওয়ায় তা হিন্দু ধর্মের মধ্যে একীভূত হয়ে যায়। বুদ্ধও হিন্দু ধর্মের অবতারে পরিণত হন।
আসলে ধর্মের মধ্যে যে ঈশ্বর বিরাজ করেন, তিনি সত্য ও সুন্দরের প্রকাশক। মানব সমাজের কৃষ্টির ইতিবাচকতার ধারক ও বাহক। ভূখণ্ডের পার্থক্যে রূপভেদ পরিবর্তিত হলেও বৃহত্তর জনসমাজ কর্মোপলক্ষের পরিণতি খোঁজেন শান্তির ললিতবাণীর মধ্যে। আর এই বাণী হল ঈশ্বরসঞ্জাত। সুখী গৃহকোণে আসুরিকতার কোনও জায়গা নেই। সুরে চলাই ঈশ্বরতত্ত্ব। বেসুর সমাজ সংহারক, তাই পরিত্যজ্য। এভাবেই সৃষ্টির উষালগ্ন থেকে অদ্যাবধি ভারতে ঈশ্বরের সফল আরাধনা হয়েছে উৎকর্ষতার লক্ষ্য নিয়ে। সে কারণে ঊর্ধ্ব-অধঃ, সব সম্প্রদায় জাত্যাভিমানকে দূরে সরিয়ে মিলেছে সুকুমারের সাধনায়, ন্যায়ের প্রতি আস্থায়, সুস্থ ধারাবাহিকতার মূর্চ্ছনায়। ঈশ্বর এভাবেই মূর্ত হয়ে ভারতীয় জনসমাজের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করছেন। এর অন্যথা পরিদৃষ্ট হলে তা তুচ্ছাতিতুচ্ছ সংখ্যার বিকারগ্রস্ত মননের পরিচয়বাহী রূপে পরিগণিত হয়। বৃহত্তর ভারতীয় জনসমাজ এভাবেই ঈশ্বরকে অবলোকন করার পক্ষে। তাই শেষ বিচারে ঈশ্বরবিশ্বাস একটি স্বতন্ত্র জীবনধারাস্বরূপ প্রতিষ্ঠিত। এ বিশ্বাস সব পথকে মেলাতে ভিন্ন ভিন্ন দেবতার অনুষঙ্গে আবির্ভূত হন। মিলনসংগীতের মূর্চ্ছনায় ভারতীয় উপমহাদেশ তাই বিশ্বে এক মহান সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের স্রষ্টা হিসাবে তাঁর গৌরবময় উপস্থিতির সগর্ব ঘোষক।

সকল বিষয়ে যৎকিঞ্চিৎ জ্ঞানার্জন করেছি তা আপনার থেকেই। সেই লব্ধ জ্ঞানের সাথে স্বীয় চিন্তন মিশিয়ে আমার তৈরি আমার ভাব জগৎ। আপনার আজকের এই লেখা আমার ভাব জগতে নতুন কিছু সংযোজন করল। ধন্যবাদ স্যার।
তুই সব লেখা পড়িস ও মন্তব্য করিস, এজন্য ধন্যবাদার্হ।