Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

অস্পৃশ্যতা দূর করাই মতুয়াদের লক্ষ্য

Share Links:

অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

প্রতিবছরের মতো এবারেও ২৭ মার্চ শুরু হয়েছে ঠাকুরনগরের ঠাকুরবাড়িতে মতুয়া ধর্ম মহাসম্মেলন। ঠাকুরবাড়ির পুকুরে ভক্তরা স্নান করে মন্দিরে পুজো দিয়ে থাকেন। ২৬ এপ্রিল থেকেই এই ধর্মীয় মেলায় ভক্ত সমাগম শুরু হয়। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, রাজ্যের বাইরে থেকেও বহু ভক্ত এই সম্মেলনে যোগ দিয়ে থাকে। এই মেলার ভক্তরা দল বেঁধে একসঙ্গে ১০-১২টি ড্রাম নিয়ে বাজাতে বাজাতে থাকেন। রাস্তাঘাট, স্টেশন, এমনকী ট্রেনের কামরাতেও ড্রাম বাজানো বন্ধ থাকে না। অন্য যাত্রীদের যে কি দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে শিয়ালদা-বনগাঁ এবং রানাঘাট-বনগাঁ সেকশনে মেলার কয়েকদিন যাতায়াত করতে হয়, তা অকল্পনীয়। এই রেওয়াজ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। রেল পুলিশ কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। যাই হোক, একথা পশ্চিমবঙ্গবাসীর ভুললে চলবে না, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।

ঠাকুরনগর হল শিয়ালদা-বনগাঁ সেকশনের একটি রেল স্টেশন। ওই স্টেশনে নেমে কিছুটা দূরেই হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের ঠাকুরবাড়ি। নদিয়া জেলার একটি বড় অংশের মানুষ মতুয়া সম্প্রদায়ের। গেদে, বগুলা, হাঁসখালি, মাঝদিয়া, রানাঘাট, শান্তিপুর, কৃষ্ণনগর, দত্তফুলিয়া হবিবপুর প্রভৃতি স্থান মতুয়া অধুষ্যিত। ওইসব অঞ্চলের মানুষ রানাঘাট-বনগাঁ লোকাল ট্রেন ধরে বনগাঁ গিয়ে সেখান থেকে বনগাঁ-শিয়ালদা লোকাল ট্রেন ধরেন। বনগাঁ থেকে দু’টি স্টেশন পরেই ঠাকুরনগর। এটা হল মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের তীর্থক্ষেত্র। তাই লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে জমায়েত হয়।

বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার ওরাকান্দি ঠাকুরবাড়ি মতুয়া সম্প্রদায়ের পবিত্র তীর্থস্থান। এটি মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর এবং তাঁর ছেলে তথা সমাজ সংস্কারক গুরুচাঁদ ঠাকুরের জন্মস্থান। হরিচাঁদ ঠাকুর ১৮১২ সালে ফরিদপুর জেলার সফলডাঙা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তিনি পিছিয়ে পড়া নিপীড়িত মানুষের হয়ে কাজ করে তাঁদের শ্রদ্ধা এবং সম্মান অর্জন করতে সমর্থ হন। বহু মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। ফলে সফলডাঙার জমিদাররা তাঁকে ষড়যন্ত্র করে গ্রামছাড়া করলে তিনি জন্মস্থান ছেড়ে ওরাকান্দিতে বসবাস শুরু করেন। তিনি সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের ওপর উচ্চবর্ণের মানুষের অত্যাচার, নিপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ১৮৬০ সালে মতুয়া মহাসংঘ গঠন করেন। সমাজের অস্পৃশ্যতা দূর করে সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে হরিচাঁদ ঠাকুরের ভূমিকা অতুলনীয়। তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে প্রতিবছর ঠাকুরনগরের ঠাকুরবাড়িতে হয় মতুয়া মহা ধর্ম সম্মেলন।

ধীরে ধীরে নিম্নবর্ণের নিপীড়িত মানুষ মতুয়া মহাসংঘের ধর্মীয় পতাকাতলে আসেন। শ্রীশ্রীহরিচাঁদের মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ মতুয়া মহাসংঘের নেতৃত্ব দেন। তিনি বর্ণবৈষম্য এবং জাতিভেদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। তিনি পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের উন্নয়নের জন্য যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, পরবর্তীকালে তা-ই মতুয়া আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। সে সময় হিন্দুদের মধ্যে বর্ণভেদ প্রথা ভীষণভাবে চালু ছিল। উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ নিম্নবর্ণের মানুষের ওপর অত্যাচার করত। এর বিরুদ্ধে মতুয়া সম্প্রদায়ের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। আর ওরাকান্দি ছিল ওই আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। উচ্চবর্ণের মানুষের কাছে ‍‘চণ্ডালরা’ অস্পৃশ্য ছিল। দীর্ঘ ৪০ বছর লড়াই করার পর গুরুচাঁদ ঠাকুর তৎকালীন বাংলা সরকারের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়ে ‍‘চণ্ডাল’ নামে আপত্তি তোলেন। যারা রাস্তাঘাট, নর্দমা, পায়খানা পরিষ্কারের কাজে যুক্ত ছিল, তাদের ‍‘চণ্ডাল’ বলা হত। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের ফলে ১৯১১ সালে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নামকরণ করা হয় নমঃশূদ্র। মতুয়া মহাসংঘ নমঃশূদ্রদের জন্য কাজ করে চলেছে। হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রপৌত্র প্রমথরঞ্জন ঠাকুর (পি আর ঠাকুর) ঠাকুরনগরে ঠাকুরবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। স্বাধীনতার পর ঠাকুরনগর কলকাতার অধীনে আসে। ভারত স্বাধীন হওয়ার আগে এটি যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখানেই প্রতিবছর মতুয়া ধর্ম মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রমথরঞ্জন ঠাকুরের স্ত্রী ছিলেন বীণাপাণি দেবী। প্রমথরঞ্জন ঠাকুরের মৃত্যুর পর বীণাপানি দেবী ঠাকুরবাড়ির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি মতুয়া সম্প্রদায়ের কাছে ‍‘বড়মা’ বলে পরিচিত ছিলেন। কয়েক বছর আগে তিনি দেহরক্ষা করেন। এখানেই প্রতিবছর মতুয়া ধর্ম মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি শ্রীহট্ট সম্মিলনীর সার্ধশতবর্ষ উদ্‌যাপন

বনগাঁর শতাব্দীপ্রাচীন শ্রীকৃষ্ণ চতুষ্পাঠী আজ অবহেলার নীরব সাক্ষী

বড়িশায় নেতাজির স্মৃতিধন্য ঐতিহাসিক অঙ্গনে আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসব

কাগজের কলম মাটিতে পুঁতলেই বেরোবে গাছের চারা

১৪ বছরের মেয়ের লেখা গল্প His Childhood Sweetheart

নেতাজির আদর্শে ছাত্র-যুবশক্তিকে একত্রিত করল জাগ্রত সংঘ

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য দৌড় কিংস্টন এডুকেশন ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের

রাসবিহারী বসু স্মৃতি পুরস্কারের অর্থ গবেষণায় দান করেছেন শমীকস্বপন ঘোষ

জন্মদিনে অভিনব উদ্যোগ, হাওড়ায় দরিদ্র সেবা

বনগাঁর ইউনাইটেড ক্লাবের পুজোয় ঘুঁটের অভিনব দৃশ্যায়ন