Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

নারী স্বাধীনতা মানে উচ্ছৃঙ্খলতা নয়

নারীর অধিকার মানে পরিবারের প্রধান পুরুষটির সঙ্গে নিত্যদিনের লড়াইয়ে নামা নয়। নারীকে যদি সত্যকারের সশক্তিকরণ করতে হয়, তবে যা প্রথমেই দরকার, তা হল, সত্যোপলব্ধি। এর জন্য দরকার সঠিক শিক্ষা।

নারী স্বাধীনতার বা যে কোনও স্বাধীনতা কিংবা অধিকারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত কর্তব্য।

Share Links:

সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

আমেরিকান সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ১৯০৮ সালে নিউইয়র্কে মহিলা বস্ত্র শ্রমিকরা কাজের খারাপ পরিবেশ ও অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ধর্মঘট করেছিলেন। সে ধর্মঘটের উদ্‌যাপনে ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই দিনটিকে প্রথম জাতীয় নারী দিবস হিসাবে মনোনীত করা হয়েছিল। তবে এর শুরু হয়েছিল অনেক আগে, ১৮৪৮ সালে। দাসত্ব বিরোধী সমাবেশে মহিলাদের কথা বলতে বাধা দেওয়ায় ক্ষুব্ধ আমেরিকান দুই মহিলা এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যান্টন ও লুক্রেটিয়া মট নিউইয়র্কে প্রথম নারী অধিকার সমাবেশে কয়েকশো লোক জড়ো করে একত্রে একটি ঘোষণাপত্র ও সংকল্পের মাধ্যমে নারীদের নাগরিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকার দাবি করে। এভাবে এক আন্দোলন জন্ম নেয়।

১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে সোশ্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনাল মিটিং করে। তারপর ১৯১১ সালের ১৯ মার্চ, ১৮৪৮-বিপ্লব ও ‍‘কমিউন ডি প্যারিস’-এর স্মরণে নারী অধিকার আন্দোলনকে সম্মান জানাতে এবং মহিলাদের জন্য সর্বজনীন ভোটাধিকার অর্জনের সমর্থন গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রতিষ্ঠা করে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারী দিবস পালিত হয়। ভোটাধিকার, সরকারি পদে নিয়োগ, নারীর কাজ করার অধিকার, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং চাকরিতে বৈষম্যের অবসানের দাবি করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রতিবাদের অন্যতম মঞ্চ হয়ে ওঠে। যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসাবে রুশ নারীরা প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করেন ১৯১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ রবিবার। ইউরোপের অন্যত্র তা হয় পরের বছরের ৮ মার্চ বা তার কাছাকাছি। মহিলারা যুদ্ধের প্রতিবাদ করতে বা অন্য কর্মীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে সমাবেশ করেছিলেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ১৯১৫ সালের ১৫ এপ্রিল হেগে মহিলাদের এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ১২টির বেশি দেশের ১৩০০-র ওপর মহিলা যোগ দেন। যুদ্ধের পটভূমিতে ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ রবিবার (যা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ৮ মার্চের সঙ্গে মিলে যায়) রুশ নারীরা ফের প্রতিবাদ ও ধর্মঘটকে বেছে নিয়েছিলেন খাদ্য ও শান্তির জন্য। চার দিন পর জার পদত্যাগ করেন এবং অস্থায়ী সরকার নারীদের ভোটাধিকার দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন শুরু হয়। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে উদ্‌যাপন শুরু করে। দু’বছর পর ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ পরিষদ সদস্য রাষ্ট্রগুলির নিজ নিজ ঐতিহাসিক ও জাতীয় ঐতিহ্য অনুসারে বছরের যে কোনও দিনে পালন করার জন্য ‘রাষ্ট্রপুঞ্জ নারী অধিকার ও আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস’ ঘোষণার মাধ্যমে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। তারপর থেকে রাষ্ট্রপুঞ্জ ও তাদের সংস্থাগুলি বিশ্বব্যাপী লিঙ্গসমতা সুরক্ষিত করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে এবং অনেক বড় সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৯৫ সালে বেজিং ঘোষণা এবং অ্যাকশনের জন্য প্ল্যাটফর্ম অনুসারে ১৮৯টি সরকার এক ঐতিহাসিক রোডম্যাপে স্বাক্ষর করে। তাতে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগজনক ক্ষেত্রের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয় এবং নারীর স্থায়ী উন্নতিকল্পে ‘২০৩০ অ্যাজেন্ডা’ স্থিরীকৃত হয়। তাতে লিঙ্গসমতা অর্জন এবং সমস্ত নারীর ক্ষমতায়নের সংকল্প গ্রহণ করা হয়।

নারী দিবস ৮ মার্চ কেন?

১৯ মার্চ, ফেব্রুয়ারির শেষ রবিবার, ১৫ এপ্রিল এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক নারী দিবস আন্দোলনের মূল দিনগুলির মধ্যে পড়ে। কিন্তু তাহলে ৮ মার্চ এল কোথা থেকে? জুলিয়াস সিজার এবং ত্রয়োদশ গ্রেগরির মধ্যে সমস্যা থেকে এটা ঘটেছে। বিপ্লবের আগে রাশিয়া গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করেনি। ১৫৮২ সালে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি রোমান সম্রাটের নামে প্রচলিত জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ত্রুটি প্রশমনের জন্য (তিনি যিশু খ্রিস্টের জন্মের ৪৬ বছর আগে সাল গণনা শুরু করেছিলেন) এই তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ব্যবহৃত হয়। ১৯১৭ সালের রাশিয়ার ২৩ ফেব্রুয়ারি তাই অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলির ৮ মার্চের সঙ্গে মিলে যায়। ঠিক তাই ৮ মার্চকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

ইউরোপে নারী স্বাধীনতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে প্রকৃত অর্থে ছিল না। নারীদের শুধু রূপচর্চা, গৃহস্থালির কাজ, শিশু প্রতিপালনের মধ্য দিয়ে জীবন কাটত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যাপক হারে সৈন্য মারা যায়। তখন সৈন্যবাহিনীর চাহিদা পূরণ করতে দেশে দেশে অসামরিক কর্মী ও আধিকারিকদের একপ্রকার বলপূর্বক যুদ্ধে পাঠানো শুরু হয়। একটা অদ্ভুত পরিসংখ্যান বেরিয়ে আসে। দেখা যায়, ইউরোপে জন্ম হার ১৯৩৯ থেকে ১৯৪২ সালের মধ্যে ৫% কমে গিয়েছে। তখন বোঝা যায়, কেন এটা ঘটেছে। শিশুর জন্ম হবে কীভাবে? পুরুষরা তো সব বাইরে। আবার অফিসে অফিসে কর্মীর অভাবে কাজ বন্ধ। তখন সে শূন্যস্থান পূরণ করতে স্বাভাবিক নিয়মের বিপরীতে গিয়ে মহিলা কর্মী নিয়োগে আর কোনও সামাজিক বাধার তোয়াক্কা করা হয় না। ব্যাপক হারে মহিলা কর্মী নিয়োগ করা হয়। এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটা অন্যতম ভালো দিক। চাপে পড়ে নারী স্বাধীনতা আসে। নারী একবার সেই মুক্তির স্বাদ পেয়ে আর তা ছাড়তে চাইল না। শুধু তাই নয়, তাঁরা বুঝলেন, স্বাধীনতা কী। তার আগে ইউরোপকিন্তু নারীর চিরাচরিত গৃহবন্দি জীবনেই বিশ্বাস রাখত। সে সময়ের সাহিত্যে এর প্রতিফলন পাওয়া যায়।

নারী স্বাধীনতা বা যে কোনও স্বাধীনতা কিংবা অধিকারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত কর্তব্য। কিন্তু সেখানে দেখা যাচ্ছে, যথেচ্ছাচার করতে গিয়ে কর্তব্যের কথা বলতে মানুষ ভুলে যাচ্ছে। নারী-পুরুষে অকারণ দ্বন্দ্বে জড়ানো, ভ্রান্ত নারী স্বাধীনতার বোধ থেকে এসব তৈরি হচ্ছে। নারীর অধিকার মানে পরিবারের প্রধান পুরুষটির সঙ্গে নিত্যদিনের লড়াইয়ে নামা নয়। নারীকে যদি সত্যকারের সশক্তিকরণ করতে হয়, তবে যা প্রথমেই দরকার, তা হল, সত্যোপলব্ধি। এর জন্য দরকার সঠিক শিক্ষা, পাঠ্যের বাইরে সমাজ, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাসমূহের সঙ্গে নিবিড়ভাবে নিজেকে পরিচিত করানো। প্রসাধন ও অঙ্গসজ্জার বাইরে বেরোতে হবে। পুরুষ বা স্বামী কোনও নারীর বিলাসব্যসন পূরণের পাত্র নন। প্রত্যেককে সমাজ ও পরিবারের নিরাপদ আশ্রয়ের সুবিধাটুকু গ্রহণের জন্য কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়। স্বাধীনতা মানে উচ্ছৃঙ্খলতা, অশালীনতা, যৌনতাগন্ধী পোশাক পরিধান, অবাধ যৌনাচার, ধূমপান বা মদ্যপান নয়।

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए