ডা. সতীনাথ ভট্টাচার্য

কাজী নজরুল ইসলাম বহু শ্যামাসংগীত লিখেছেন। তাই একদল মৌলবাদী তাঁকে কাফের বলে দেগে দিয়েছে। আবার মৌলবাদীরাই নজরুলকে সসম্মানে জাতীয় কবির আসনে বসিয়েছেন, যেহেতু তিনি অনেক গজল ও ইসলামি সংগীত রচনা করেছেন। এই আচরণগত স্ববিরোধকে গত ১৮ জানুয়ারি কৃষ্ণনগর ক্যাথিড্রাল চার্চ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ‘সর্বধর্ম ভ্রাতৃত্ব সমাবেশ’-এ ধিক্কার জানালেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, কবি ও ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, ‘কোরানের একটি আয়াতে বলা আছে, সৃষ্টিকর্তা চাইলে সবাইকে একটাই ধর্মমতের অনুসারী করতে পারতেন। সে ক্ষমতা তাঁর আছে। কিন্তু তিনি তা করেননি। কেননা তিনি বিভিন্নতা পছন্দ করেন।’ কোরানের আর একটি আয়াতে ধর্ম নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করা বারণ আছে বলেও সাহাবুদ্দিন জানান।
আসলে শ্রীচৈতন্যদেব ও চাঁদ কাজীর নদিয়া চিরকালই প্রেম দিয়ে হিংসাকে জয় করে এসেছে। এই জেলা সম্প্রীতির মন্ত্রে দীক্ষিত। আর এই জেলার কৃষ্ণনগরের মাটিতে মিশে আছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং দ্বিজেন্দ্রলালের পদধূলি। তাই এই সমাবেশে ধ্বনিত হল মানবপ্রেমের জয়গান, যা প্রতিটি ধর্মেরই মূল ভিত্তি। বিশপ নির্মল গোমস গেয়ে ওঠেন, ‘আমাদের হৃদয় প্রেম দিয়ে তুমি গড়ো, ওহে প্রেমের কবি।’ রেভারেন্ড পাস্টার অশোক মণ্ডল বলেন, প্রভু জিশু বারবার বলেছেন ঈশ্বর ও প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হতে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমবর্ধমান হত্যা-নির্যাতন দেখে মন খুবই খারাপ। হতাশা জন্ম নিচ্ছে। মানবতা আজ ধূলিলুণ্ঠিত। সেখানে মনুষ্যত্বের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে ধর্মীয় পরিচয়। তাই এত মারামারি, হানাহানি। আমরা বেমালুম ভুলে গিয়েছি নজরুলের সেই কথা, ‘তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ, ভজনালয়/ ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!’ তাই গত ১৯ জানুয়ারি ‘বিশ্ব ধর্ম দিবস’-এর আগের দিন অর্থাৎ গত ১৮ জানুয়ারি কৃষ্ণনগর ক্যাথিড্রাল চার্চ কর্তৃপক্ষ এই মহতী সমাবেশের আয়োজন করেছিল। আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘বহুধার্মিক পরিবেশে ভ্রাতৃত্ব, সহিষ্ণুতা ও মানবিকতা’। উপস্থিত বিভিন্ন ধর্মের আধ্যাত্মিক গুরুরা এ বিষয়ে আলোকপাত করেন। কৃষ্ণনগর শঙ্কর মিশনের প্রধান শঙ্কর শুদ্ধ চৈতন্য মহারাজ বলেন, ‘ধর্ম মানে ধারণ করা।’ তাঁর কথায়, আনন্দকে ধারণ করাই হল ধর্ম। ধর্ম নিয়ে হানাহানি অনেক হয়েছে, আর নয়।’ এবার আগামী প্রজন্মের জন্য নতুন কিছু অর্থাৎ মানবপ্রেম রেখে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে নজরুলের ‘মোরা একই বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’ গানের সঙ্গে মনোরম নৃত্য পরিবেশন করেন মিঠুন দত্ত এবং বিরোচন দাস। মনে প্রশ্ন জাগে, এ গান কি এখনও কেবল আমাদের কণ্ঠ থেকেই ধ্বনিত হবে, অন্তর থেকে নয়? নজরুল ‘রুদ্রমঙ্গল’-এর অন্তর্গত ‘হিন্দু-মুসলমান’ নিবন্ধে যথার্থই লিখেছেন, ‘অবতার-পয়গম্বর কেউ বলেননি, আমি হিন্দুর জন্য এসেছি, আমি মুসলমানের জন্য এসেছি, আমি খ্রিস্টানের জন্য এসেছি। তাঁরা বলেছেন, আমরা মানুষের জন্য এসেছি আলোর মতো, সকলের জন্য। কিন্তু কৃষ্ণের ভক্তরা বললে কৃষ্ণ হিন্দুদের, মহম্মদের ভক্তরা বললে মহম্মদ মুসলমানদের, খ্রিস্টের শিষ্যরা বললে খ্রিস্ট খ্রিস্টানদের। কৃষ্ণ, মহম্মদ, খ্রিস্ট হয়ে উঠলেন জাতীয় সম্পত্তি! আর এই সম্পত্তি নিয়েই যত বিপত্তি।’ সমাবেশের শেষে গাওয়া হয় সমাপ্তি সংগীত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা’।
বাড়ি ফেরার পথে মনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল কাজী কবির কথা, যা তিনি লিখে গিয়েছেন ‘ছুঁৎমার্গ’ নিবন্ধে, ‘হিন্দু হিন্দু থাক, মুসলমান মুসলমান থাক, শুধু একবার এই মহাগগনতলের সীমাহারা মুক্তির মাঝে দাঁড়াইয়া মানব, তোমার কণ্ঠে সেই সৃষ্টির আদিম বাণী ফুটাও দেখি। বলো দেখি, আমার মানুষধর্ম। মানবতার এই মহাযুগে একবার গণ্ডি কাটিয়া বাহির হইয়া আসিয়া বলো যে, তুমি ব্রাহ্মণ নও, শূদ্র নও, হিন্দু নও, মুসলমান নও, তুমি মানুষ, তুমি সত্য।’
