সুদীপনারায়ণ ঘোষ
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অবসরপ্রাপ্ত ম্যানেজার

ছোটবেলা থেকেই সবাই যে কথাটা শুনে বড় হয়েছে বা এখনও হয়, তা হল, জিনিসের দাম কী বেড়েছে! কথাটার মধ্যে অনেক ধাঁধা আছে। বড়রা আমাদের বলেছেন, আমরাও বলছি আমাদের ছোটদের। যে জিনিসের দাম নিয়ে লোকের রোজ মাথা খারাপ হয়, তা হল আনাজ।
দাম বাড়াটা চিরকালীন ঘটনা এবং অর্থনীতির সূত্র অনুসারে কিছুটা মুদ্রাস্ফীতি উন্নত বা উন্নয়নশীল অর্থনীতির সূচক। কিন্তু এ সত্ত্বেও বলা যায় যে, এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে যে হারে সবজির দাম বেড়েছে, তা কিছুটা অস্বাভাবিক। কিন্তু তার চেয়েও যেটা আশ্চর্যের, তা হল, আগে দাম বাড়ার মধ্যেও একটা তালমিল থাকত, এখন সেটা থাকে না। আজ যে সবজির দাম ৪০ টাকা প্রতি কেজি, কাল সেটা যে ৮০ বা ১০০ হবে না, এটা বলা যাবে না। অর্থাৎ ক্রেতার সঙ্গে একটা লুকোচুরি চলছে। এই ঘটনা ঘটেছে গত ১২-১৩ বছরে। বাজারের একটা নিজস্ব গতি, ছন্দ থাকে, সেই তাল বা ছন্দ থাকছে না কেন?
আসলে সবজির বাজারটা এখানে অনেকদিন ধরেই চলে গিয়েছে ফড়েদের হাতে, এমন নালিশ অনেকেরই। এটা একেবারে সত্যি নয়, তা বলা যাবে না। আবার পুরোটাও নয়। ধরা যাক, বারুইপুর বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার একজন সবজি উৎপাদক তাঁর আনাজ শিয়ালদহ কোলে বাজারে বিক্রি করলেন একজন পাইকারের কাছে। সেটা গেল একজন খুচরো বিক্রেতার কাছে। সেখান থেকে তিনি সেটা তাঁর নিজ এলাকায় নিয়ে গিয়ে খুচরো বাজারে বিক্রি করলেন উপভোক্তার কাছে। অর্থাৎ সবজি উৎপাদক ও অন্তিম ভোক্তার মাঝে দু’জন রয়েছেন। কিন্তু আজকাল দু’জনের জায়গায় তিনজন চলে আসছেন মাঝখানে। এর কারণ বাজারে চাকরি বা উপার্জনের অভাব বা রাজনীতির চালকরাই এমন হাত বদলদারের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছেন।
এমনটা আগের সরকারের আমলেও কিছুটা ছিল। কিন্তু বিগত ১২-১৩ বছরে যেটা নতুন ঘটেছে, সেটা হল, এসব মূল ব্যবসাদার ছাড়াও তোলাবাজের সংখ্যা বেড়েছে। এই ল্যাটারেল বা পার্শ্ববর্তী ঘটক বা দালাররা কোনও পরিশ্রম না করেই নিজ নিজ প্রভাব খাটিয়ে তোলা তোলেন। আগেও তুলতেন, কিন্তু এখন তা লাগামছাড়া। কারণ এ সময় সব ক্ষেত্রে অবনমন হয়েছে। সব ক্ষেত্রে এখন এই নিয়ন্ত্রণহীনতা এ রাজ্যের একটা কলঙ্কজনক বৈশিষ্ট্য হয়ে গিয়েছে। আগেও তোলা আদায় ছিল, কিন্তু এখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আর এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, কিছু লোকের হাতে টাকা রয়েছে। তাঁরা এই বর্ধিত দাম দিতে পারেন, দেনও। আর এই তোলাবাজরা বিষয়টি বুঝে গিয়েছেন। তাই তাঁরা যে কোনও উৎসব, পার্বণ, ছুটির দিন তোলা বাড়িয়ে দেন এবং সরকারি বা কর্পোরেট চাকরিজীবীরা বা বড় ব্যবসাদাররা সেসব আরামেই কেনেন। সমস্যায় পড়েন কম আয়ের মানুষ। বাজারে গেলে এমন কথা কানে আসে, সরকারি চাকুরেদের মাইনে বেড়েছে কত! আর সবজির দাম বাড়বে না! কিন্তু গোটা রাজ্যে কতজন সরকারি চাকরিজীবী? বাজারের দাম কি তাঁদের মাইনে দেখে ওঠা-নামা করার কথা? অধ্যাপকদের মাইনে বেড়েছে বলে বাজারে কচুর দাম চড়িয়ে দেওয়া কি যথার্থ? সামান্য আয়ের মানুষের সংখ্যা কি ভারতে অতি নগণ্য? বেকার কি নেই বললেই চলে? তাঁদের কি সবজি খাওয়ার ইচ্ছা হয় না?
মাঝেমধ্যে প্রশাসন লোকদেখানো বাজার পরিদর্শনে বেরিয়ে দাম কমায় বটে, তবে তা দু’দিনের জন্য থাকে। তারপর আবার তা স্বস্থানে ফিরে আসে এবং এভাবেই চাকা ঘুরে চলে। এটাই লুকোচুরি খেলা।
