Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

সত্য প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং শাস্ত্রীয় অনুশাসন (শেষ পর্ব)

মা সারদা বলেছিলেন, ‘‘যেখানে যেমন, সেখানে তেমন, যখন যেমন, তখন তেমন, যার সঙ্গে যেমন, তার সঙ্গে তেমন।’’

Share Links:

মানস চক্রবর্তী

শুধু যুক্তি-তর্ক দিয়ে যেমন ধর্মকে বোঝা যায় না, তেমনই ধর্মকে বোঝার জন্য শাস্ত্রসমূহ প্রামাণিক সত্য হতে পারে না। তাহলে সাধারণ মানুষ এক দার্শনিক জটিলতার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল। যুক্তি-তর্ক-ধর্ম বোঝার ক্ষেত্রে অকৃতকার্য। কারণ যিনি যত বুদ্ধিমান, তিনি তত ক্ষুরধার যুক্তি উপস্থাপন করবেন। দার্শনিকরা এরূপ স্থলে সূক্ষ্ম বিচারবোধের কথা বলে থাকেন। এরূপ সূক্ষ্ম বিচারবোধ সাধারণের মধ্যে থাকা বেশ জটিল। আবার ঠাকুরের মতো আত্মসমর্পণ ভাবও নেই। তাহলে উপায়? এক্ষেত্রে আমাদের শুধু মনে রাখতে হবে, যাতে সমস্ত প্রাণীর কল্যাণ হয়, মঙ্গল হয়, সেটাই ধর্ম।

শ্রীকৃষ্ণের যুক্তির কাছে অর্জুন একটু নরম হলেন। তখন অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বললেন, তাহলে এখানে এমন একটা সমাধান সূত্র বলুন, যাতে সাপও মরবে, অথচ লাঠিও ভাঙবে না। আমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা হবে, আর মহারাজ যুধিষ্ঠিরও বাঁচবেন। শ্রীকৃষ্ণ বললেন, সম্মানীয় ব্যক্তির সম্মানটাই জীবন। কিন্তু তাঁকে যদি অপমান করা হয়, তবে সেটা হবে তাঁর কাছে মৃত্যুতুল্য। তোমাকে তাই করতে হবে। যুধিষ্ঠিরকে তুই বলে সম্বোধন করতে হবে। তারপর তাঁকে প্রণাম করে সান্ত্বনা দিয়ে তোমার অনুচিত বাক্যের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।

শ্রীকৃষ্ণের যুক্তি অর্জুনের প্রাণে ধরল। তারপর অর্জুন যুধিষ্ঠিরকে তুইতোকারি করে গালাগালি করলেন।”তুই চুপ কর্। কথা বলিস না। তুই তো নিজেই যুদ্ধ থেকে এক ক্রোশ দূরে পালিয়ে এসেছিস। তুই কী নিন্দা করবি? হ্যাঁ, ভীমসেনের আমাকে নিন্দা করার অধিকার আছে, কারণ তিনি জগতের সমস্ত প্রসিদ্ধ বীরের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন।… তুই তোর কটু বাক্যের দ্বারা আমাকে আর আঘাত করিস না, আমার ক্রোধ আর বাড়াস না।” সেই সঙ্গে নিজের বীরত্ব নিয়ে একটু বড়াই করতেও ছাড়লেন না। তিরস্কার ও আত্মশ্লাঘা দ্বারা যুধিষ্ঠিরকে বেশ ভালোরকম বিদ্ধ করলেন। তারপর অর্জুন প্রণত হলেন যুধিষ্ঠিরের চরণে এবং ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। এই স্থলে ধর্মবোধ ও বিচারের মধ্যে একটি নৈতিকতার সৃষ্টি হল, যা মধ্যমেধা, নিম্নমধ্যমেধা মানুষের বিচারবোধকে সুরক্ষিত রাখবে।

রামায়ণেও ঠিক একই বিচারবোধ লক্ষ করা গিয়েছে। একবার কাল এসে উপস্থিত হলেন শ্রীরামচন্দ্রের কাছে। বললেন, তোমার সঙ্গে আমার গোপন কথা আছে। কিন্তু কাল শর্ত রাখলেন, তাঁদের কথাবার্তার মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি এলে শ্রীরামচন্দ্র তাঁকে বধ করবেন। শ্রীরামচন্দ্র স্বীকার করে নিলেন কালের শর্ত। লক্ষ্মণকে রাখলেন পাহারায়। কালের সঙ্গে শ্রীরামচন্দ্রের কথোপকথন চলছে। এমন অবস্থায় এসে উপস্থিত হলেন দুর্বাসা মুনি। ঠিক তখনই দুর্বাসা দেখা করতে চাইলেন শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে। লক্ষ্মণ বাধা দিলেন। দুর্বাসা কোনও কথাই শুনতে চাননি। লক্ষণও পথ ছাড়তে অপ্রস্তুত। দুর্বাসা রেগে গিয়ে বললেন, আমি সবাইকে এখনই ভস্ম করে দেব। লক্ষ্মণ তখন বিচার করলেন, সকলের বিনাশ কাম্য নয়। তার বদলে একা আমারই মৃত্যু হোক। তিনি শর্ত ভেঙে শ্রীরামচন্দ্রের কাছে গেলেন। শ্রদ্ধার সঙ্গে লক্ষ্মণ শ্রীরামচন্দ্রের কাছে সব নিবেদন করে বললেন, হে সৌম্য, আমাকে পরিত্যাগ করে তোমার প্রতিজ্ঞা পালন করো। কেননা “হীনপ্রতিজ্ঞাঃ কাকুৎস্থ প্রয়ান্তি নরকং নরাঃ”, অর্থাৎ যাঁরা প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেন না, তাঁরা নরকে যান। শ্রীরামচন্দ্র পড়লেন মহাসংকটে। একদিকে প্রাণপ্রিয় ভাইকে বধ করার কষ্ট, অন্যদিকে ধর্ম নষ্ট হওয়ার ভয়। অনেকক্ষণ ভেবে শ্রীরামচন্দ্র একটি উপায় নির্ণয় করলেন। লক্ষ্মণকে বললেন,
“বিসর্জয়ে ত্বাং সৌমিত্রে মা ভূদ্ধর্মবিপর্যয়ঃ।
ত্যাগো বধো বা বিহিতঃ সাধূনাং হ্যূভয়ং সমম্।।” অর্থাৎ শ্রীরামচন্দ্র এমন একটি উপায় ঠিক করলেন, যাতে লক্ষ্মণকে বধ করতে না হয় এবং ধর্মও নষ্ট না হয়। এজন্য শ্রীরামচন্দ্র লক্ষ্মণকে ত্যাগ করলেন। কারণ সাধুদের কাছে ত্যাগ এবং বধ উভয়ই সমান।

অন্য পোস্ট: সবার নাগালে হোক চিকিৎসা ব্যয়

যুধিষ্ঠিরের একবার নরক দর্শন হয়েছিল। কারণ তিনি নাকি একটি মিথ্যে কথা বলেছিলেন, “অশ্বথামা হতঃ।” তবে সেটা যে একটি হাতি, তা জানাতেও ভোলেননি, কিন্তু অনুচ্চস্বরে। ফলে সেটি দ্রোণাচার্যের কর্ণগোচর হয়নি। এখন প্রশ্ন হল, তাঁর মতো সত্যবাদীর মিথ্যে বলার প্রয়োজন হল কেন? উত্তর মহাভারতেই আছে। স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে প্রথাগত নিয়ম অতিক্রম করেই যুদ্ধ জয়ের চেষ্টা করতে বলেছেন। শুধু যুদ্ধ করে দ্রোণাচার্যকে জয় করা যাবে না, ‘নৈষ যুদ্ধেন সংগ্রামে জেতুং শক্যঃ কথঞ্চন”। অথচ যুদ্ধ জয়টা খুব দরকার। কারণ যুদ্ধটা ধর্মযুদ্ধ ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে। ভীষ্ম হোন, দ্রোণ বা কর্ণ, তাঁরা সকলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্যায়কারী ও অন্যায় সমর্থনকারী। অন্যায় করা এবং অন্যায় সহ্য করা দুটোই সমান দোষযুক্ত। “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে,/ তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।” সুতরাং কপট লোকের সঙ্গে কপট ব্যবহার করাই উচিত, “মায়াচারো মায়য়া বর্তিতব্যং।” বিদুরের এই কথাটিকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে সমর্থন করলেন। অগ্রিম অপ্রিয় খবর শোনাতে হবে দ্রোণাচার্যকে। পুত্রের মৃত্যুর খবর শোনাতে হবে, যা শুনলে দ্রোণাচার্য অস্ত্র ত্যাগ করবেন। সেটাই হবে তাঁকে মারার সুবর্ণ সুযোগ। এখানে লক্ষণীয়, ছলনার আশ্রয় নেওয়া হল। বিচারহীন ‘সত্যং বদ’ নয়, বরং ‘ধর্মং চর’ প্রতিষ্ঠা করলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।

অজ্ঞাতবাসের সময় বিরাট রাজসভায় ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির এমন অনেক মিথ্যে কথা বলেছিলেন, যেগুলি মিথ্যে বলে পরিগণিত হয়নি। বলেছেন, আমি একজন ব্রাহ্মণ। আমার সব অপহরণ হয়ে গিয়েছে। তাই আমি জীবিকা উপার্জনের আশায় আপনার কাছে এসেছি। তারপর মহারাজ বিরাট যখন ছদ্মবেশী যুধিষ্ঠিরের নাম, গোত্র, বিদ্যার খবর জানতে চাইলেন, তখনও যুধিষ্ঠির মিথ্যে কথা বললেন, ব‌্যাঘ্রপদ গোত্রে আমার জন্ম। নাম কঙ্ক। পূর্বে আমি যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে থাকতাম। পাশাখেলায় আমার বিশেষ জ্ঞান আছে। এরূপ মিথ্যে কথা বলা সত্ত্বেও যুধিষ্ঠিরকে মিথ্যাবাদী বলা হচ্ছে না। কারণ প্রাণ বাঁচানোর জন্য মিথ্যে বললে তা অধর্ম নয় বা সেগুলি মিথ্যে বলে গণ্য হবে না। সেগুলি যদি মিথ্যে হত, তাহলে একবার নয়, অনেকবার যুধিষ্ঠিরকে নরক দর্শন করতে হত। ধর্মের উপদেশ প্রসঙ্গে আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, পরোপকারঃ পুণ্যায় পাপায় পরপীড়নম্।

শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কথা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, মা সারদার কথা দিয়ে লেখা শেষ করব— ‘‘যেখানে যেমন, সেখানে তেমন, যখন যেমন, তখন তেমন, যার সঙ্গে যেমন, তার সঙ্গে তেমন।’’

4.5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए