শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

গ্রামের ঠাঁইপাশে কোথাও সরকারি জঙ্গল বা তেমন কোনও বন নেই। তবু নাম তপোবন। ঝোপের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিলে সাদা ধবধবে দ্বারকেশ্বর নদ নজরে পড়ে। উত্তরে ঢিলছোড়া দূরত্বে দ্বারকেশ্বর, গন্ধেশ্বরী ও একটি ছোট্ট বহমান জোড়ের মিলনস্থল। এ-যেন বাঁকুড়ার প্রয়াগরাজ। বাঁকুড়ার নবদ্বীপ। এই তপোবন গ্রাম বাঁকুড়ার ওন্দার সানতোড় গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত। এমন পবিত্র স্থানেই তো দেবদেবীর বাস হয়। গ্রামের আশপাশে রয়েছে বহু গ্রাম। যেমন, সানতোড়, নতুনগ্রাম, কমলপুর, মালাতোড়, বালিয়াড়া, বীরবাঁধ, হরিহরপুর, গড়কোটালপুর, সায়র-বাকড়া।
হরিহরপুরের প্রাচীন শিবমন্দির খুব বিখ্যাত। দ্বারকেশ্বর পায়ে হেঁটে টপকালেই ওপারে ভূতশহর, অলা, সাহাপুর, বাঁকি, সেন্দড়া, পলাশডাঙা, প্রতাপপুর প্রভৃতি গ্রাম। সমস্ত গ্রামজুড়ে সবজি খেত। কৃষিপ্রধান এলাকা।
ওন্দা থানার তপোবন গ্রাম রথযাত্রার জন্য বিখ্যাত। রথযাত্রা মানে অকাল রথযাত্রা। এই রথযাত্রা শ্রীরামচন্দ্রের রথযাত্রা। ৩৫০ বছরের বেশি প্রাচীন এই রথযাত্রার বিশেষত্ব হল, এটা শুরু হয় দুর্গাপুজোর বিজয়া দশমীর দিন থেকে। চলে আটদিন। মহাপুজো ভাঙার বেদনায় বাঙালি যখন অস্থির থাকে, তখনই রথযাত্রা উৎসব শুরু হয় তপোবন ও আশপাশের গ্রামজুড়ে। স্থানীয়রা এই রথযাত্রা উৎসবকে বলেন পঞ্চগ্রামী রথযাত্রা। হাজার হাজার মানুষ রথযাত্রা দেখতে ভিড় করেন। মেলা বসে। তপোবন গ্রামে ঢুকতেই রয়েছে পাকা রথের মন্দির। কিছুটা দূরেই রয়েছে সাদা রং করা আলোকমালায় সজ্জিত রঘুনাথজিউর মন্দির। রয়েছে রথের মেলাতলা। সারা বছরই রঘুনাথজিউর মন্দিরে চলে পুজো-অর্চনা। মন্দিরের কোনও দেবোত্তর সম্পত্তি নেই। আদায়কৃত অর্থেই উৎসব ও পুজো চলে। বিজয়া দশমীর দিনেই শ্রীরামচন্দ্র বা রঘুনাথজিউর রথ এই মন্দিরে আসে। রথের উপর শালগ্রাম শিলার নারায়ণ, শ্রীরামচন্দ্র, লক্ষ্মণ, সীতা, হনুমান, জাম্বুবানদের চড়িয়ে সংকীর্তন সহকারে মেলাপ্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করানো হয়। এই এলাকাজুড়ে এত বড় উৎসব আর একটিও হয় না। আগে এ সমস্ত গ্রামে কোনও দুর্গাপুজো হত না। বর্তমানে সানতোড়-গড়কোটালপুর রাস্তায় দুর্গাপুজো হয়। সানতোড় গ্রামের উপকণ্ঠে রয়েছে শিবের মন্দির।
অন্য পোস্ট: ফিরে আসুক পোস্টকার্ডে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা জ্ঞাপন
কিন্তু সবকিছুকে ম্লান করে দিয়ে এখানের প্রাণের উৎসব একটিই, তপোবনের শ্রীরামচন্দ্রের পেতলের রথযাত্রা। বহু জনশ্রুতি রয়েছে এই গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন দেবতা শ্রীরামচন্দ্রকে নিয়ে। কথা হচ্ছিল মন্দির কমিটির সভাপতি রবিলোচন ঘোষ, সহ-সভাপতি হীরেন পাত্র, সম্পাদক আনন্দমোহন পাত্র, মেলা আয়োজক কমিটির সম্পাদক গণেশ পাত্রদের সঙ্গে। তাঁরা শোনাচ্ছিলেন জনশ্রুতি ও মাহাত্ম্যের কথা। কোনও একসময় ভক্তরা রান্না চড়িয়ে ভোগ তৈরি করতে গিয়ে দেখেন আগুন জ্বালাতে না জ্বালাতেই রান্না প্রস্তুত। ঠাকুরের এমন মাহাত্ম্য দেখে হতবাক হয়ে যান উপস্থিত সকলেই। আর একবার এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল। মন্দিরের কয়েকশো মিটার দূরে দ্বারকেশ্বর নদ। একবছর প্রবল বন্যা হয় নদে। বন্যার জল প্লাবিত করে তপোবন ও আশপাশের গ্রাম। ফাঁকা জায়গায় রঘুপতিজিউর মন্দির। গ্রামবাসী মন্দিরের কথা ভেবে ভয় পেয়ে যান। চারদিক তখন বন্যার জলে নিমজ্জিত। মন্দিরের দেবতাকে দ্বারকেশ্বরের বন্যা নিয়ে চলে যেতে পারে, এই উৎকণ্ঠা ও দুর্ভাবনায় সাঁতরে মন্দিরের কাছে এসে দেখেন, মন্দির যেন বহু উঁচু দ্বীপে পরিণত হয়েছে। আশ্চর্য হয়ে যান গ্রামবাসী। শিউরে ওঠেন। এমন মাহাত্ম্য আজও মানুষের মুখে মুখে ঘোরাফেরা করে।
এ বছরও রথের মেলা জমে উঠেছে। রথের দড়িতে টান পড়ছে সন্ধ্যা হলেই। অগণিত ভক্তের সমাবেশ। নরনারায়ণ সেবা হয়েছে। দড়ির টানে রথ যাচ্ছে রথঘর অবধি। আবার ফিরে আসছে। মন্দির থেকে ৬০০-৭০০ মিটার দূরেই রথঘর। অষ্টমদিন অর্থাৎ শেষদিনে রথ বের হয় খুব ভোরে। শ্রীরামচন্দ্র ও অন্যরা রথে চড়ে নানা বাদ্যসহকারে যান রথঘর অবধি। তারপর আর রথ ফেরেন না। দেবতাদের রথ থেকে নামিয়ে বিগ্রহগুলি মাথায় নিয়ে রথের পথ এড়িয়ে ঘুরপথে মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। দেবতাহীন শূন্য রথ চলে যায় তপোবন গ্রামের ভিতরে রথমন্দিরে। মন বিষণ্ণ হয়ে যায় পঞ্চগ্রামী মানুষজনের। কেউ কেউ চিৎকার করে কেঁদে মাটিতে গড়াগড়ি যান। চোখের জলে শেষ হয় অকাল রথযাত্রা। আবার একবছরের অপেক্ষা শুরু হয়ে যায়। ভারতে এমন রথযাত্রা আর কোথাও হয় না।
