Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

সামাজিক সীমাবদ্ধতার বিপরীত স্রোতে মানুষের আবেগের অন্বেষণ ‘চারুলতা’

'চারুলতা' নিছক ‘নিঃসঙ্গ স্ত্রী’র গল্প নয়, বরং সামাজিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উদগ্রীব মানুষের আবেগের সঙ্গে তার সংঘাতের গভীর অনুসন্ধান এবং তা থেকে বেরিয়ে মুক্তির দিশা খোঁজার এক অনবদ্য প্রয়াস। চারুলতা আজও ততটাই প্রাসঙ্গিক রয়ে গিয়েছে, যেমনটা মুক্তির সময় ছিল।

'চারুলতা' ছবিতে আইকনিক ‘বাগানের দৃশ্য’

Share Links:

সুদীপনারায়ণ ঘোষ

রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ ছোটগল্প ‘নষ্টনীড়’ অবলম্বনে নির্মিত সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী ধ্রুপদী চলচ্চিত্র ‘চারুলতা’র ৬০ বছর পূর্ণ হল। ১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্র ইংরেজিতে ‘দ্য লোনলি ওয়াইফ’ বা ‘নিঃসঙ্গ স্ত্রী’ নামে পরিচিত। বিদেশে তো বটেই, বাংলার বাইরে অন্য প্র্রদেশেও এই নামেই প্রসিদ্ধ। কিন্তু এই নামকরণ পুরো সার্থক নয়, কারণ এটা শুধু কোনও এক নিঃসঙ্গ স্ত্রীর গল্প নয়, সামাজিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে মানুষের আবেগের অভিক্ষেপ।

আজকের বিশ্বে সৃজনশীল অভিব্যক্তির বিভিন্ন রূপ এবং সাংস্কৃতিক নিদর্শন  সংস্কৃতির আধুনিক সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে চিরাচরিত ঐতিহ্যগত ধারণার বিপরীতে। নবতর বৌদ্ধিক ও নান্দনিক অনুশীলনের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি এগিয়ে যাচ্ছে। তাই আজকের সংস্কৃতিকে একটি নির্দিষ্ট স্থান বা কালের অন্তর্গত সব মানুষের সমানুভূতি, দৈনন্দিন অনুশীলন এবং বৈশিষ্ট্য হিসাবে দেখা হয়। এই বৃহত্তর উপলব্ধি সত্ত্বেও শিল্পকলার ক্লাসিকিজম বা ধ্রুপদীয়ানা এখনও যথেষ্ট পরিমার্জিত আকারে চিহ্নিত করা যায়। এ ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায়ের এই মাস্টারপিস চলচ্চিত্রকর্ম ‘চারুলতা’র চেয়ে ভালো উদাহরণ আর নেই।

‘চারুলতা’কে সত্যজিৎ রায়ের সবচেয়ে প্রিয় চলচ্চিত্র মনে করা হয়। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, এটাই তাঁর সবচেয়ে নিখুঁত ছবি। এই চলচ্চিত্রটি শৈল্পিক ধ্রুপদীয়ানার শীর্ষবিন্দুকে স্পর্শ করে দর্শকদের প্রাচীন গ্রিসের রেনেসাঁ এবং আধুনিক যুগে ধ্রুপদী দর্শনের শিকড়ে ফিরিয়ে আনে। সঙ্গতি, সংযম ও প্রতিষ্ঠিত মানের শর্ত মেনে চলার অঙ্গীকারযুক্ত ধ্রুপদীয়ানা আছে এতে।

ছবিটির প্রারম্ভিক দৃশ্যসজ্জা ও পরবর্তী আইকনিক বাগানের দৃশ্যে সুন্দরভাবে সেই ধ্রুপদীয়ানা আঁকা হয়েছে। এই দৃশ্যগুলি ধ্রুপদী দৃষ্টিভঙ্গি, সুষম আঙ্গিক, সরলতা, পরিমিতি, স্বচ্ছতা এবং সংযত আবেগের ওপর জোর দেয়। মূলধারার সিনেমার প্রচলিত বর্ণনামূলক কাঠামোর বাইরে বেরোতে দর্শকদের অনুপ্রাণিত করে এবং চলচ্চিত্রকে ধ্রুপদী শিল্পকলার সম্প্রসারণ রূপে মান্যতা দেওয়ার আহ্বান জানায়।

অন্য পোস্ট: প্রেমিক বিভুতিভূষণ তাঁর প্রকৃতিপ্রেমের মতোই আন্তরিক

‘চারুলতা’র কালক্রম ব্রিটিশ ভারতের ১৯ শতকের কলকাতা। চলচ্চিত্রটিতে দেখা গিয়েছে মহৎ মানসিক সংযম এবং অত্যাশ্চর্য সিনেমাটোগ্রাফি। তাই তা আজও ৬০ বছর আগের মতোই সতেজ এবং প্রভাবশালী রয়ে গিয়েছে।

শ্রেষ্ঠ চরিত্রে মাধবী মুখোপাধ্যায় কমনীয় অভিনয় করেছেন। উদাস, অথচ পরিশীলিত স্ত্রী রূপে চারুলতার চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। চারুলতার স্বামী ভূপতি (শৈলেন মুখোপাধ্যায়) একজন সংবাদপত্র সম্পাদক। তিনি গর্বিত মুক্তচিন্তক, কিন্তু তাঁর রাজনীতি এবং নিজস্ব বোধের জগতে নিমগ্ন। স্ত্রীর মানসিক ও বৌদ্ধিক চাহিদা উপলব্ধি করতে অক্ষম।

চারুলতার জীবনের দ্বৈধতা সম্পর্কে সত্যজিতের উপস্থাপনা জানালা থেকে নিঃশব্দে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ করা খাঁটি দৃশ্যকাব্য বা ভিসুয়াল কবিতার মতো মনে হয়। ভূপতির পিসতুতো ভাই অমল (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, লেখক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। তাঁর মধ্যে সূক্ষ্ম রোমান্টিক উত্তেজনা আছে। অমল ও চারুলতার মধ্যে সূক্ষ্ম যৌন উত্তেজনাকে সত্যজিৎ রায় নিপুণভাবে পরিচালনা করেছেন। সেই সঙ্গে তাঁরা রচনাপাঠ, লেখা, স্বপ্ন ও স্মৃতির মাধ্যমে স্বাধীনতা ভোগ করেন। সূক্ষ্ম অঙ্গভঙ্গি, চকিৎ দৃষ্টি এবং মৃদু সুরগুঞ্জনের মাধ্যমে  শৈল্পিক আবেগ প্রকাশ দেখানো হয়েছে  এই চলচ্চিত্রে।

অন্য পোস্ট: মহামায়া

চারুলতার দৃশ্যগুলির শৈল্পিক মান অসাধারণ। বাগানের দৃশ্য  বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্রপ্রেমী ও চলচ্চিত্র সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তা দৃশ্য মাধ্যমের প্রকৃতি ও সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করার এক ধ্রুপদী উদাহরণ। এতে দেখা যায়, অমল একটি লনে শুয়ে আছেন লেখার ভাব সঞ্চারের জন্য। আর চারুলতা চলন্ত দোলনায় বসে আছেন। গোপনে তাঁর প্রতি বিস্ময়ে বিমুগ্ধ। মন্থর, কিন্তু আকর্ষক ক্যামেরার কাজ। এই দৃশ্যে উপযুক্ত বিন্যাস চারুলতার মধ্যে গভীর আকাঙ্ক্ষার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। তাঁর মধ্যে অনুরণিত এক ভিন্ন জীবনের আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত দেয়। সেখানে তিনি তাঁর গভীর আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে মুক্ত, স্বাধীন। তাঁর রুদ্ধ আবেগ মুক্তির জানালা খুঁজে পায়।

‘চারুলতা’ এক রক্ষণশীল সমাজে নারীর হতাশায় নিমজ্জিত হন না। তার চেয়েও বেশি কিছু। এটা তাঁর মুক্ত ইচ্ছাপ্রকাশের সাহসের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। এই চলচ্চিত্র পরিবর্তন ও অগ্রগতির সঙ্গে সংগ্রামরত সমাজে স্বাধীনতাকাঙ্ক্ষী এক নারীর মানসিক ও বৌদ্ধিক সীমাবদ্ধতাগুলিকে খুঁজে ফেরে।

এই চলচ্চিত্রের চূড়ান্ত দৃশ্যটি বিশ্ব চলচ্চিত্রে সবচেয়ে অবিস্মরণীয় সমাপ্তিদৃশ্যগুলির অন্যতম। সত্যজিৎ রায় নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি একে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। এটা চলচ্চিত্রের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত দৃশ্যগত উপসংহার। ফিল্মের শেষ দৃশ্যে ভূপতি, যাঁকে আমরা শেষবার ঘোড়ার গাড়িতে বসে নীরবে কাঁদতে দেখেছি, তিনি সন্ধ্যায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাঘুরি করে বাড়ি ফিরে আসেন। চারু  জানেন, তিনি যে অমলের প্রতি প্রণায়বিষ্ট এবং তাঁর চলে যাওয়ার সংবাদে শোকাতুর, ভূপতি তা দেখেছেন, শুনেছেন। প্রতিক্রিয়ায় স্বামী কী করেন, সেই আশঙ্কায় চারু উৎকণ্ঠিতভাবে অপেক্ষা করছেন। ভূপতির পায়ের শব্দে চকিত হয়ে তিনি দরজা খুলে দেন।  দ্বিধাকম্পিত স্বরে বলেন, ‘এসো।’ তিনি ও ভূপতি দু’জনেই তাঁদের হাত বাড়ান। আলো ও ছায়ায় মেশা মায়াবী শিহরণ জাগানো দৃশ্য। হাত মেলে না এবং সেখানে ক্যামেরার ফ্রেমে নিঃসঙ্গ প্রাসাদে সিনেমা শেষ হয়ে আসে। গৃহভৃত্য দীপ জ্বালাচ্ছে। দৈনন্দিনতায় ছেদ পড়ে না, কিন্তু দুটো মানুষের মধ্যে সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ছেদ পড়ে। আলো জ্বলেও জ্বলে না। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। সেটাই ট্র্যাজেডির হিমায়িত উচ্চারণ।

‘চারুলতা’র প্রযুক্তিগত সাফল্য অসাধারণ। সেখানে সত্যজিৎ রায় তাঁর প্রোডাকশনের প্রতিটি দিক, স্ক্রিপ্ট থেকে শুরু করে সুরারোপ এবং ক্যামেরা পরিচালনার কাজ পর্যন্ত পরিপূর্ণতা ও পারঙ্গমতার সঙ্গে করেছেন। তার ফলে ধ্রুপদী শিল্পের এক অত্যাশ্চর্য এবং আবেগমথিত শিল্পকর্ম আমরা উপহার পেয়েছি।

সব শেষে জানাই, ‘চারুলতা’ নিছক ‘নিঃসঙ্গ স্ত্রী’র গল্প নয়, বরং সামাজিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উদগ্রীব মানুষের আবেগের সঙ্গে তার সংঘাতের গভীর অনুসন্ধান এবং তা থেকে বেরিয়ে মুক্তির দিশা খোঁজার এক অনবদ্য প্রয়াস। চারুলতা আজও ততটাই প্রাসঙ্গিক রয়ে গিয়েছে, যেমনটা মুক্তির সময় ছিল। এটা চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে সত্যজিৎ রায়ের প্রতিভার এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए