Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

সফরনামা ২: সিকিমের অশেষ পাহাড়ি সৌন্দর্য

টাইটানিক ভিউ পয়েন্ট। ছবি: অধিরাজ গাঙ্গুলি।

Share Links:

রিম্পা হোড়

চলে এলাম আমাদের ঘুরুঘুরুর পরবর্তী অংশ নিয়ে। আগেই জানিয়েছিলাম যে, পাহাড়ের কোলে আমরা বোরং বলে একটা অফবিট জায়গায় পৌঁছেছি। কাছেপিঠে দর্শনীয় স্থান বলতে সেভাবে কিছুই নেই। কিন্তু জায়গাটার সৌন্দর্য মনে হয় ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়। লোকালয় থেকে প্রায় এক কিলোমিটার ভিতরে হোমস্টেটা রাস্তার ঠিক গায়ে। আর রাস্তার আর একপাশ দিয়ে উঠে গিয়েছে পাহাড়। হোমস্টের ঘরগুলি অদ্ভুত। রাস্তা থেকে নীচের দিকে নেমে গিয়েছে যে জায়গাটা, সেখানে দুটো ঘর রয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে যে, পাহাড়ের খাঁজ কেটে এই ঘর বানানো। পাহাড়ি এলাকায় অধিকাংশ বাড়ি, হোটেল, হোমস্টে অবশ্য তা-ই। ওই হোমস্টের ডেকোরেশন, মালিক পক্ষের আতিথেয়তা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ, সবকিছু মিলিয়ে জাস্ট মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কিছুই নেই, কী অদ্ভুত নিস্তব্ধতা! কিন্তু এই নিস্তব্ধতাই যেন রোজকার কোলাহল, মন খারাপ, চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ্ব থেকে আগলে রাখে।

আমাদের ঘরগুলোর সঙ্গে ছিল ব্যালকনি। সেখান থেকে দূরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অনেকটা সবুজ চোখে পড়ছিল। এদিকে বিকেল হতেই সেখানে শুরু হয়ে গিয়েছিল বৃষ্টি। বৃষ্টি যত বাড়ছিল, পাল্লা দিচ্ছিল ঠান্ডাও। মনে হচ্ছিল, যেন থেকে যাই সেখানেই। সেদিন সন্ধ্যা থেকে রাত আমাদের খুব ভালোই কাটে। পরদিন তাড়াতাড়ি বেরোনোর তাড়া ছিল না। কারণ আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল ছিল রাভাংলা। যেহেতু বোরং গ্রামটি রাভাংলার কাছেই, তাই অনেকটা রাত পর্যন্ত জেগে পরদিন আমরা কিছুটা দেরি করেই বেরিয়েছিলাম। কিন্তু ওইদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। কারণ আকাশের মুখ ভার। রাভাংলার বুদ্ধ পার্কে যে ভালো ছবি উঠবে না, তা আন্দাজ করে নিয়েছিলাম। ওই বুদ্ধ পার্কের পাশের রাস্তা দিয়েই আমরা এই বোরঙে যাই। তখন অনেকটা আশা ছিল যে, ক্লিন ভিউ পেলে খুব সুন্দর করে জায়গাটার ছবি তুলে স্মৃতি হিসাবে নিয়ে কলকাতা ফেরা যাবে। কিন্তু তা আর হল না। যাই হোক, ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। তার আগে নিজেদের রীতি অনুযায়ী হোমস্টে কর্তৃপক্ষ আমাদের উত্তরীয় পরিয়ে বিদায় জানাল।

হোমস্টে থেকে বেরিয়ে আমরা চলে গিয়েছিলাম টাইটানিক ভিউ পয়েন্টে। সেই টাইটানিক, যার দুর্ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আজও মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। সেই টাইটানিক, যার দুর্ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি সিনেমার নায়ক-নায়িকার মতো ইতিহাস লেখা প্রেম-ভালোবাসা চায় আজকের প্রজন্মও। তাহলে সেই টাইটানিক সিকিমে গেল কীভাবে? তার ভিউ পয়েন্টই বা হল কী করে? পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট রাজ্য সিকিমে তো কোনও সাগর নেই। ফলে প্রশ্ন জাগতেই পারে। আসলে টাইটানিক জাহাজের সামনের দিকে যে সুচালো আকৃতি, সেটাই পাহাড় কেটে বানানো হয়েছে। অনেকগুলো সিঁড়ি পেরিয়ে ওই পয়েন্টে পৌঁছতে হয়। সিঁড়িগুলো বেশি খাড়াই নয় বটে, কিন্তু প্রস্থ খুবই কম। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হল যে, ওই সিঁড়িগুলির একপাশে রয়েছে খাদ। সে খাদের গভীরতা পরিমাপ করার সাহস আমাদের ছিল না। আমরা পাশাপাশি দু’জন হেঁটে সিঁড়িগুলি পেরোনোর সাহস পর্যন্ত পাইনি। একজন একজন করে যেদিকে খাদ নেই, সেদিক ঘেঁষে আমরা উপরে উঠলাম। আর মুখ বাড়িয়ে যেটুকু খাদ দেখা যায়, তাতেই আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। খুব সাবধানে সন্তর্পণে আমরা ওই ভিউ পয়েন্টে পৌঁছলাম। এখানে দু’টি বিষয় না বললেই নয়। কোনও পর্যটক যদি মনে করেন, সিঁড়ি দিয়ে যাবেন না, সেক্ষেত্রে গাড়ি করে সোজাসুজি ভিউ পয়েন্টে পৌঁছনো সম্ভব। আর দ্বিতীয়ত, ভিউ পয়েন্টের সিঁড়ির ঠিক মুখেই রয়েছে একটি দোকান আর রয়েছে কতকগুলি সারমেয়। আমরা পৌঁছতেই তারা আমাদের ঘিরে ধরেছিল। ওরা হয়তো বোঝার চেষ্টা করছিল যে, আমরা আদৌ ক্ষতিকর কি না। কিন্তু প্রবল ঘ্রাণশক্তিতে ওরা যখন বুঝতে পারল, না, এরা শুধুই টুরিস্ট, তখন আমাদের গাইড করে স্পটে যেতে। তার আগে প্রথমে ওদের বিস্কুট খাওয়াতে হয়। এটুকুই ওদের দাবি। আমরা যখন ভিউ পয়েন্টের উদ্দেশে রওনা হলাম, দেখি, ওরা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। আমরা যেখানে দাঁড়াচ্ছি, ওরাও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ছে। আমরা ফের হাঁটা দিলে ওরাও হাঁটছে। এভাবে ওরা একদম পয়েন্ট পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল আমাদের সঙ্গে। সেখানে আমরা অনেকটা সময় ছিলাম। টাইটানিক সিনেমার কিছু সিন মনে করে সেইমতো মনের খুশিতে ছবিও তোলা হল। অবাক করা কাণ্ড, ওই গোটা সময়টা ওরা কিন্তু ঠায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করেছিল। ফের যখন আমরা রওনা দিই ফেরার জন্য, তখন ঠিক একইভাবে আমাদের সঙ্গে ওরা ফিরে চলে এল ঠিক আগের জায়গায়। ও হ্যাঁ, আমরা আসার সময় রাস্তা দিয়ে এসেছি। সে রাস্তা দিয়ে গাড়ি পর্যটকদের ভিউ পয়েন্টে পৌঁছে দেয়। সেখানে আরেকটি দোকান আছে। সেখানে ভিউ পয়েন্টের জন্য ফি কাটতে হয়।

রালং মনাস্ট্রি।

এবার আমরা চলে যাই রালং মনাস্ট্রিতে। বিশাল জায়গা নিয়ে ওই মনাস্ট্রি। ভিতরে ঢুকতে বিশেষ কোনও বাধা পেরোতে হয়নি। সেখানে টুরিস্ট বলতে ছিলাম আমরাই। এতটা শান্ত পরিবেশ আমি জানি না, কোথায় পাওয়া যাবে। একেবারে পাহাড়ের কোলে, ওই মনাস্ট্রির পরিবেশ মনটাকে স্নিগ্ধ করে দেয়। মন ভালো রাখার জন্য পরিবেশ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আরও একবার প্রমাণ হয়ে যায় ওই মনাস্ট্রিতে ঢুকলে।

অন্য পোস্ট: নারীজাতি আজও প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি

সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা রওনা হলাম রাভাংলার মেন আকর্ষণ বুদ্ধ পার্কের দিকে। আসার পথে ড্রাইভার দাদাকে অত্যন্ত সতর্কভাবে গাড়ি চালাতে হয়েছিল। কারণ হঠাৎ করে এত মেঘ এসে গিয়েছিল যে, কিছুটা দূরের দৃশ্য বোঝা যাচ্ছিল না। বুদ্ধ পার্কের কাছে আমরা পৌঁছে সত্যি সত্যিই খুবই হতাশ হলাম। এত মেঘ হঠাৎ করে কেন চলে এল! আমরা নিজেদের ভাগ্যকেই দোষারোপ করলাম। দ্বিধায় ছিলাম যে, বুদ্ধ পার্কে ঢুকব কি না। কারণ ঢুকে তো কিছুই দেখতে পাব না। তাই একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকে চা-মোমো খেয়ে কিছুটা সময় নষ্ট করলাম, যাতে মেঘ সরে যায়। কিন্তু নাহ্! মেঘের মনোভাবের কোনও পরিবর্তন হল না। সেই সঙ্গে মারাত্মক ঠান্ডাও লাগছিল। এখানে একটা অনুভূতি শেয়ার করি। এত মেঘের মাঝে মনে হচ্ছিল, যেন সেগুলি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলায় টিভিতে মহালয়ায় যেমন দেখতাম, সাদা মেঘের মধ্যে দেবতারা বসে আছেন, সেখানে অনেকটা সেরকমই অনুভূতি হচ্ছিল। মেঘগুলি গা ঘেঁষে সরে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত আনমনে পার্কের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ঠিক করলাম, যাই, পার্কটা ঘুরেই আসি।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

ভ্রমণ দোঁহা ১০

ভ্রমণ দোঁহা ৯

ভ্রমণ দোঁহা ৮

ভ্রমণ দোঁহা ৭

ভ্রমণ দোঁহা ৬

ভ্রমণ দোঁহা ৫

ভ্রমণ দোঁহা ৪

ভ্রমণ দোঁহা ৩

ভ্রমণ দোঁহা ২

ভ্রমণ দোঁহা