মানস চক্রবর্তী

অনেকদিন বাদে ফের গিয়েছিলাম কোরো পাহাড়ে। আশ্রমে যখন পৌঁছলাম, তখন দুপুরের রোদ অনেকটাই পড়ে গিয়েছে। প্রথম বিকেল। কিন্তু রোদের তাপ ছিল। আশ্রমে সন্ন্যাসী, ব্রহ্মচারী কাউকেই দেখতে পেলাম না। হয়তো বিশ্রাম নিচ্ছেন। ভাবলাম, আগে মাকে দর্শন করে আসি। অনেকেই যাচ্ছে। আমরাও চলা শুরু করলাম।
মূল আশ্রম থেকে মায়ের মন্দির পৌঁছনোর জন্য সুন্দর সিঁড়ি বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাঝখানে একটি বিশ্রামাগার রয়েছে। বয়স্ক মানুষ একবারে উঠতে না পারলে সেখানে বসে বিশ্রাম নেন। আগে ওঠার জন্য সিঁড়ির ব্যবস্থা ছিল না। পাথর বেয়ে কষ্ট করেই উঠতে হত।
গঙ্গাজলঘাঁটি গ্রাম পঞ্চায়েতের বদান্যতায় সিঁড়ি এবং বিশ্রামাগার বানানো হয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে পুরোনো দিনের কত কথা মনে পড়তে লাগল। প্রথম গিয়েছিলাম স্যারের হাত ধরে। পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সদানন্দ মহারাজের সঙ্গে। অমন অমায়িক সাধু আমার ক্ষুদ্র জীবনে কমই দেখেছি। আমাকে নিয়ে গিয়ে একেবারে বিছানায় বসালেন। আমি অভিভূত। সাধুরা সহজে কাউকে নিজের রুমে প্রবেশ করতে দেন না। প্রসাদ দিয়েছিলেন কি না, এখন মনে নেই। আস্তে আস্তে পরিচয় গাঢ় হল। মাঝেমধ্যেই যেতে লাগলাম। পরিচয় হল পার্থ মহারাজের সঙ্গে। আশ্রমে সবাই বলতেন পার্থদা। আমি অবশ্য মহারাজই বলতাম।
একদিন সন্ধ্যাবেলায় পার্থ মহারাজের রুমে রয়েছি। মাথাটা কোলের উপর দিয়ে বললেন, ‘নে হাত বুলিয়ে দেয়।’ আমি হাত বুলিয়ে দিচ্ছি আর মহারাজ আত্মভোলা মানুষের মতো কত কথা বলছেন। সব কথা এখন মনেও নেই। আমি খুব পাতলা ছিলাম, তাই মহারাজ হেসে বলতেন, ‘শোন, তোর কাঠামোটায় ভগবান মাংস কম লেপেছেন, আর আমারটাই বেশি। এই যা তফাৎ।’ বলে মহারাজ হাসতেন, আমিও।
আর সাধন মহারাজ একটু বেঁটে ছিলেন। আমি যে সময় আশ্রমে যাতায়াত করছিলাম, তখনই মহারাজের প্রস্রাবের সমস্যা শুরু হয়েছিল। মহারাজ বসে আছেন, হয়তো প্রস্রাব পড়ে গেল, বুঝতে পারতেন না। কিন্তু সরল মনের মানুষ ছিলেন। সরল না হলে সাধু হওয়া যায় না।
অন্য পোস্ট: সুখী গৃহকোণে আসুরিকতার জায়গা নেই
আর একজন ছিলেন ব্রহ্মচারী ফটিক। আমি তাঁকে ফটিকদা বলতাম। সাদা পোশাক। ধুতি আর গেঞ্জি পরে অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন।
আশ্রমের বিষ্ণু মন্দির ও মায়ের মন্দিরে যিনি পুজো করতেন, তাঁর বাড়ি ছিল সম্ভবত পাত্রসায়েরে। অসম্ভব বকবক করতেন। কোনও জায়গায় পাঁচ মিনিটও বোধ হয় স্থির হয়ে বসতে পারতেন না। সদানন্দ মহারাজ বলতেন, অশান্ত প্রাণের লক্ষণ। একবার মহারাজ বললেন, ‘মানস, তুমি পুজো করতে পারো। আজ একটু মায়ের পুজো করতে হবে।’ সম্ভবত সেবারে পুরোহিত ছিলেন না। বললাম, আমি তো পুজো তেমন জানি না, মহারাজ। পুজো তো আমি করি না। ঠিকমতো পুজো করতে জানিও না। তিনি বললেন, ‘ব্রাহ্মণের ছেলে। খুব পারবে।’ বললাম, মহারাজ, আমি তো ধুতি আনিনি। তিনি বললেন, ‘ধুতি দেব।’ বলেই মহারাজ বাক্স থেকে নতুন ধুতি বের করে দিলেন।
পুজো করলাম। পুজোর বিশেষ কিছুই জানি না। মা হয়তো সেদিন হেসেছিলেন অবোধ বালকের পাগলামি দেখে। আশ্রমে একটি বটগাছ ছিল। চারদিকে চাতাল বানানো। সেখানেই ছোট একটি শিবলিঙ্গ স্থাপিত ছিল। সঙ্গে ছোট মন্দির। সন্ধ্যাবেলায় চাতালে আশ্রমের সাধুরা, উপস্থিত ভক্তরা সবাই একসঙ্গে বসে গল্প গুজব করতেন। সে আড্ডার স্বাদ অপূর্ব। অভিজ্ঞতা না থাকলে বোঝানো বেশ বেগের।
পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা করতে করতে পৌঁছে গেলাম মায়ের মন্দিরে। দেখলাম, মন্দিরে রঙের কাজ চলছে। মিস্ত্রিরা কাজ করছেন। মূল মন্দির থেকে মাকে সরিয়ে পিছনের ঘরে রাখা হয়েছে। সেখানে মা অষ্টভুজা। আটটি হাত মায়ের। সিংহের উপর চেপে আছেন। মন্দিরে কাচের বাক্সের মধ্যে কয়েকজন সাধুর মূর্তি রয়েছে। সম্ভবত পাথরের। তাঁরা ওই আশ্রমেরই বরিষ্ঠ সন্ন্যাসী। মূল মন্দিরের পিছনে একটি বটবৃক্ষ রয়েছে। বেদির উপর ঘট বসানো। একটি ত্রিশূল পোঁতা। শিবলিঙ্গ একটি নয়, বেশ কয়েকটি রয়েছে। তবে একটি বড়, বাকিগুলি ছোট। পাহাড়টি খুব ছোট। উচ্চতা ৪০০-৫০০ ফুট। নাম মহিমানন্দ তপোবন পাহাড়। সেটি অমরকানন ব্লকের কাপিষ্ট গ্রামে রয়েছে। সেখানে বৈষ্ণবী মতে মায়ের পুজো হয়। ভক্ত সমাগম সারা বছর লেগেই থাকে। মা খুব জাগ্রত। তাই ভক্তরা বিভিন্নরকমের মানত করে থাকে মায়ের কাছে। সেটি সাবিত্রী মন্দির নামেও পরিচিত। সকাল আটটা থেকে ১২টা এবং বিকেল চারটে থেকে ছ’টা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে। পাহাড়ের নীচে আশ্রম রয়েছে। আশ্রমে বিষ্ণু মন্দির রয়েছে। সেখানে শুধু ভগবান বিষ্ণু রয়েছেন, সঙ্গে লক্ষ্মী বা রাধা নেই।
মূল মন্দিরটি প্রথম থেকেই ছাদবিশিষ্ট। তবে চারপাশে টালির আচ্ছাদন ছিল। ভক্তদের ইচ্ছায় নতুনভাবে তৈরি হয়েছে বিষ্ণু মন্দিরটি। ভগবান বিষ্ণু ছাড়াও আশ্রমের বিভিন্ন সাধু-মহাত্মার ছবি রয়েছে। সেখানকার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, বিষ্ণু এবং পার্বতী মাকে তেলেভাজা ও মুড়ির ভোগ দেওয়া হয় সকালবেলায়। দুপুরে থাকে অন্নভোগ।
অন্য পোস্ট: পরকীয়া প্রেমের বীভৎসতা
মাকে দর্শন করে নীচে আশ্রমে নেমে গেলাম। একজন মহারাজকে দেখলাম, তবে অচেনা। আশ্রমেরই কোনও ঘনিষ্ঠ ভক্ত আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘চা খাবেন?’ আমি আপত্তি জানালাম। তিনি বললেন, ‘খান, খান। চা বেশি করা হয়ে গিয়েছে।’ মহারাজ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কোথা থেকে আসা হচ্ছে?’ আমি ঠিকানা বললাম। ঠিক বুঝতে পারলেন না তিনি। বিষ্ণু মন্দির তখনও খোলেনি। আমি আশ্রমটি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম।
বটতলার চাতালে একজন মহারাজ এবং অন্য কয়েকজন বসে রয়েছেন। আমিও সেখানে গেলাম। দেখি, ফটিকদা। তিনি গেরুয়া বসন পেয়েছেন। আমি আগে যখন যেতাম, তখন তিনি ব্রহ্মচারী। সাদা পোশাক ছিল। বললাম, চিনতে পারছেন? তিনি মুখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। বোঝা গেল, ঠিক চিনলেন না। বললাম, আমি মানস। এখানে আগে আসতাম। রাত্রিবাসও করেছি। তখন সদানন্দ মহারাজ ছিলেন।
আমি ফের বললাম, মহারাজ, আমার সাহাপুরে বাড়ি। ওলা সাহাপুর। হাট বসে।
মহারাজ বোধ হয় তখন একটু একটু চিনলেন। বললেন, ‘বসো, বসো।’
রংয়ের মিস্ত্রিরা তাঁদের কতটা কাজ হল, তা মহারাজকে বোঝাচ্ছেন। আরও রং লাগবে বলে তাঁরা মহারাজকে জানালেন। মহারাজ বললেন, ‘লাগলে নিয়ে এসো।’ একটি ছেলে খালি রঙের কৌটোগুলি নিয়ে চলে গেল।
মহারাজ বললেন, ‘সদানন্দ মহারাজ নেই। বেশ কয়েক বছর আগে দেহ রেখেছেন।’ আমি জানতাম খবরটা। স্যার আমাকে বলেছিলেন। তবুও শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। পার্থ মহারাজ? জিজ্ঞাসা করলাম। মহারাজ বললেন, ‘তিনি তো সদানন্দ মহারাজের আগেই গিয়েছেন।’
আমি জানতাম না। মনটা দমে গেল।
মহারাজের সঙ্গে বসে গল্প করতে লাগলাম। মহারাজ বললেন, ‘একজন এসেছিলেন মন্দির দেখতে। তিনি আমাদের আশ্রমের ভক্ত বা শিষ্য নন। নিজেই বললেন, মন্দিরটা রং করালে আপনাদের কোনও সমস্যা আছে? আমি বললাম, না না সমস্যা থাকবে কেন! করান।’
আমি বললাম, দেখুন, মহারাজ, এখনও মানুষ আছে।
মহারাজ বললেন, ‘বিকার বেশি। জাগ্রত অবস্থা তো বটেই। স্বপ্ন সুষুপ্তিতে বিকার থাকে। কামনাই তো স্বপ্ন হিসাবে আসে। সুষুপ্তিতেও সূক্ষ্ম কামনা থাকে।’
আমি মাথা নাড়লাম। তিনি বললেন, ‘লোক ভাবে, সাধুরা বসে বসে খায়, আলস্য করে, অথচ কত লোক এল, টিকতে পারল না।’
বললাম, হ্যাঁ, মহারাজ। সাধু হওয়া অত সোজা নয়।
গুরুর প্রসঙ্গ উঠল। মহারাজ বললেন, ‘গুরু হওয়া মুখের কথা নয়।’ ডুমুরদহে তাঁদের গুরুদেব শ্রীমৎ স্বামী অভয়ানন্দ ব্রহ্মচারীজির অলৌকিক কিছু ঘটনা বললেন, ‘আশ্রমে সাধুরা একটি অনুষ্ঠান অন্যত্র গিয়েছেন। তখন সদানন্দ মহারাজ, পার্থদা সবাই রয়েছেন। গুরুদেব তখন এখানে রয়েছেন। আমরা সবাই বসে আছি। হঠাৎ গুরুদেব একটি কাঁধ ঝাঁকালেন। আমরা সকলেই অবাক হলাম। কিন্তু বিষয়টি বুঝলাম না। পরে সদানন্দ মহারাজরা আশ্রমে ফিরে বললেন, গুরুদেব, আজ একটা দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিলাম। গাড়িটা একটা গাছে লেগে আটকে গেল। না হলে উলটে যেত। ঠিক যে সময় গাড়িটা গাছে আটকে গিয়েছিল, তখনই গুরুদেব এই আশ্রমে বসে কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিয়েছিলেন। আমরা সবাই এতক্ষণে গুরুদেবের সে ঝাঁকুনির কারণটা বুঝতে পারলাম।’
বললাম, হ্যাঁ, মহারাজ, গুরুরা অন্তর্যামী হয়। মহারাজ বললেন, ‘সদগুরু মানে গুরুদেব খুব সৎ, এমনটা নয়। সৎ একটা অবস্থা। যিনি সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ, এই তিন গুণের অতীত, তিনিই সদগুরু।’
অন্য পোস্ট: জার্মান জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেননি হিটলার
আরও কিছুক্ষণ মহারাজের সঙ্গে সৎ চর্চা হল। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। উঠতে হবে। মহারাজও উঠে দাঁড়ালেন। আমরা (আমি এবং আমার সঙ্গী দাদা) প্রণাম করলাম।
বিষ্ণু মন্দিরে ঘণ্টা বেজে উঠল। আরতি শুরু হবে। পুরোহিত পুজোয় বসেছেন। আমরা ভগবান বিষ্ণুকে প্রণাম করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম।
