কাজল মুখার্জি
গোয়া নামটি শুনলে আমাদের মাথায় প্রথমে কী মনে আসে? সম্ভবত বিভিন্ন সমুদ্র সৈকত, দেশি-বিদেশি নারী-পুরুষের সমুদ্রস্নান ও রৌদ্রকরোজ্জ্বল সমুদ্রতটে স্নান, নির্মল সবুজ প্রকৃতি, নানারকম পুরোনো ফোর্ট, পর্তুগিজ চার্চ এবং তার অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপত্য, নানারকম পানীয়ের সম্ভার, সামুদ্রিক মাছের দারুণ স্বাদের রান্না, মনোমুগ্ধকর হোটেল ও রেস্টুরেন্ট আর গোয়ার নিজস্ব নাইট লাইফের ছবি। এছাড়াও গোয়ায় আছে আরও অনেক কিছু।
কলকাতা থেকে গোয়া যাওয়ার জন্য সহজ এবং তুলনামূলকভাবে একটু সময় বেশি লাগলেও বাজেট ফ্রেন্ডলি উপায় হল ট্রেনে করে যাওয়া-আসা। এছাড়া মুম্বই/বেঙ্গালুরু হয়ে গোয়া যাওয়া যেতে পারে। শালিমার স্টেশন থেকে গোয়া যাওয়ার ডাইরেক্ট ট্রেন অমরাবতী এক্সপ্রেস (ট্রেন সংখ্যা ১৮০৪৭)। শালিমার স্টেশন থেকে সপ্তাহে চারদিন (সোম, মঙ্গল, বৃহস্পতি এবং শনিবার) রাত ১১টা ১৫ মিনিটে ছাড়ে। পরের গোটা দিন ট্রেনে কাটিয়ে তৃতীয়দিন দুপুর ৩টে ৪৫ মিনিটে পৌঁছয় ভাস্কো দা গামা জংশনে। প্রায় ৪০ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের এই জার্নির জন্য ভাড়া স্লিপার ক্লাস ৮০০ টাকা, থ্রি-টায়ার এসি ২,১০০ টাকা, টু-টায়ার এসি ৩,১০০ টাকা।
রিটার্ন ট্রেন অমরাবতী এক্সপ্রেস (ট্রেন সংখ্যা ১৮০৪৮) ভাস্কো দা গামা স্টেশন থেকে (রবি, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শুক্রবার) সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে পরদিন রাত ১১টা ৩৫ মিনিট নাগাদ শালিমার স্টেশনে পৌঁছয়। ফ্লাইটের টিকিট কলকাতা বিমানবন্দর থেকে গোয়ার ডাবোলিম বিমানবন্দর পর্যন্ত একপিঠের মাথাপিছু ভাড়া ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। কতদিন আগে টিকিট কাটা হবে, তার ওপর নির্ভর করে। আর সিনিয়র সিটিজেন হলে কিছুটা কনসেশন পাওয়া যায়। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে গোয়া বিমানবন্দরে ফ্লাইটে যেতে সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা।
আমরা অবশ্য গোয়া যাতায়াত করেছিলাম ট্রেনে। গোয়ায় হোটেলের ভাড়া তুলনামূলকভাবে একটু বেশিই, বিশেষ করে সিজনে অনেকটাই বেশি। বর্ষাকাল বা অফ সিজনে তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম থাকে। হোটেলের মান যথেষ্ট ভালো। তবে আগে অনলাইনে হোটেল বুক করে যাওয়াই ভালো। তাতে বিভিন্ন দিক থেকে অনেকটাই সুবিধা হয়। গোয়ায় ঘোরার জন্য প্রয়োজনমতো বিভিন্ন ধরনের গাড়ি পাওয়া যায়। নিজেদের সুবিধামতো এবং প্রয়োজনমতো গোয়া গিয়ে দর কষাকষি করে গাড়ি ভাড়া করাই ভালো। তাতে নিজেদের ইচ্ছামতো ভ্রমণ করা যায়। আর বিভিন্ন দ্রষ্টব্য স্থানে নিজেদের সুবিধামতো যাওয়া যায় এবং সময়েরও সাশ্রয় হয়।
অন্য পোস্ট: সফরনামা (শেষ পর্ব): সিকিমের অশেষ পাহাড়ি সৌন্দর্য
আমি রেলে চাকরি করার সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার সুযোগ হলেও গোয়া যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি এতদিন। যদিও কয়েকবার সে চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু অফিসের ও পারিবারিক নানারকম কাজের চাপে এবং সময় ও সুযোগের অভাবে সেটা আর বাস্তবে হয়ে ওঠেনি।
গোয়ায় রয়েছে অনেক মনোমুগ্ধকর সমুদ্র সৈকত। সেগুলির নাম আরামবোল বিচ, মর্জিম বিচ, মান্দ্রেম বিচ, অঞ্জুনা বিচ, বগা বিচ, ক্যালাঙ্গুট বিচ, কোলভা বিচ, ক্যান্ডলিম বিচ, পালোলেম বিচ, আগোন্ডা বিচ, পাটনেম বিচ, বগমালো বিচ বেনৌলিম বিচ, মজোর্দা বিচ, ভার্কা বিচ, ক্যাভেলোসিম বিচ, ভ্যাগাটর বিচ, সিঙ্কেরিম বিচ, মিরামার বিচ, ডোনা পলা বিচ প্রভৃতি। এগুলির মধ্যে বগা বিচ সবচেয়ে বিখ্যাত। এটি রাতের যাপন, সৈকত পার্টি এবং সামুদ্রিক খাবারের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত
আরামবোলকে উত্তর গোয়ার দর্শনীয় সেরা স্থানগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। দু’পাশ পাহাড় বেষ্টিত। মিষ্টি জলের হ্রদ এবং কাছাকাছি ছিমছাম বাজার রয়েছে। মরজিম বিচ গোয়া পর্যটনের মাস্টারপিস। বিভিন্ন ধরনের পাখি দেখার জন্য একটি দুর্দান্ত জায়গা। মরশুমি অলিভ রিডলি কচ্ছপের বাসা বাঁধার জায়গা। সুন্দর অঞ্জুনা সমুদ্র সৈকতে রয়েছে মৃদু দুলতে থাকা পাম গাছ এবং বালির বিশাল বিস্তৃতি। বিভিন্নরকম পাথরের গঠন ওই সমুদ্র সৈকতকে এক অনন্য রহস্যময় রূপ দিয়েছে। গোয়া সমুদ্র সৈকতের রানি হল ক্যালাঙ্গুট সৈকত। তা তার সোনালি ঝিকিমিকি বালির জন্য বিখ্যাত।
গোয়ায় সমুদ্রের রং কোথাও ঘন নীল, কোথাও আবার ঘোলাটে। সে এক অপরূপ সামুদ্রিক দৃশ্য। পালোলেম বিচ গোয়ার নির্মল সমুদ্র সৈকতগুলির মধ্যে একটি। আগোন্ডা সৈকত বেশ নির্জন আর ঢেউগুলি শান্ত। তাই মানুষ সাঁতার কাটতে এবং সূর্যস্নানের জন্য সেখানে যান।
অন্য পোস্ট: তারাশঙ্করকেই শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক মনে করতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আমরা বর্ষাকালে গোয়া গিয়েছিলাম। সে সময় গোয়ায় ঘোরার অনেকগুলি অসুবিধা আছে। প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে বর্ষাতি ব্যবহার করতে হয়। সমুদ্র উত্তাল থাকে। ফলে বেশির ভাগ সি বিচে ওই সময় রেড অ্যালার্ট জারি করা থাকে। আবার সে সময় গোয়া গেলে অনেকগুলি সুবিধাও আছে। গোয়া সফর বেশ খরচসাপেক্ষ, এতে সন্দেহ নেই। বিশেষ করে মরশুমে। সেখানকার সিজন হল শীতকাল, বিশেষ করে ডিসেম্বর-জানুয়ারি, বড়দিনের সময়। তখন সেখানে হোটেল, গাড়ি ভাড়া ভীষণ চড়া থাকে। সহজে পাওয়াও যায় না। আর সবচেয়ে বড় কথা, সিজনে প্রচুর সংখ্যক দেশি-বিদেশি টুরিস্টের ভিড়ে গোয়া ভ্রমণ সে সময় ঠিকমতো উপভোগ করা যায় না। এটা আমার মত।
আমরা ভ্রমণ শুরু করেছিলাম উত্তর গোয়া থেকে। সেখানে রয়েছে বগা বিচ, ভ্যাগাটার বিচ, অঞ্জুনা বিচ, ক্যালাঙ্গুট বিচ, সিংকেরীম বিচ প্রভৃতি। তবে যদি এটা তুলনা করা হয় যে, উত্তর গোয়া, নাকি দক্ষিণ গোয়া, কোনটা ভালো? তাহলে বলা যেতে পারে, উত্তর গোয়ার প্রাণবন্ত পার্টি দৃশ্য এবং রাতের যাপন যেন বেশি মুগ্ধ করে। উত্তর গোয়ায় বার, ক্লাব ও অনেকগুলি সৈকত শ্যাক রয়েছে, যেখানে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত নাচ-গান চলে। যাঁরা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং প্রাণবন্ত পরিবেশ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য উত্তর গোয়া উপযুক্ত জায়গা। উত্তর গোয়ার সমুদ্র সৈকত ক্যালাঙ্গুট, বাগা এবং অঞ্জুনা বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত এবং সেখানে বেশি ভিড় থাকে। ওই সৈকতগুলিতে বিভিন্ন ধরনের জলক্রীড়া, সমুদ্রতীরবর্তী কার্যকলাপ, রেস্তোরাঁ এবং স্টোর রয়েছে। আরপুরার রাতের বাজার এবং অঞ্জুনা ফ্লি মার্কেট উত্তর গোয়ার সুপরিচিত মার্কেট স্পট।
উত্তর গোয়া সফরের পর আমরা গেলাম দক্ষিণ গোয়া। সেখানে আমরা গিয়েছিলাম কাবো দে রামা দুর্গে। সেটি দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণ গোয়ার দু’টি সুপরিচিত সমুদ্র সৈকত কাভেলোসিম এবং আগোন্ডার মধ্যে। ওই দুর্গ পরিদর্শন করার সময় সংস্কৃতির বহু স্থাপত্য দেখে বিস্ময় জাগে। ওই দুর্গের চূড়ায় পৌঁছনো যায় একটি পথ দিয়ে। কাবো দে রামা দুর্গ থেকে আরব সাগর দেখা যায়।
অন্য পোস্ট: রবীন্দ্রনাথের রঙ্গপ্রিয়তা ৩
ডোনা পলা পয়েন্টের নামকরণ ভারতের ভাইসরয় ডোনা পলা ডি মেনজেসের কন্যার নামে করা হয়েছে, যিনি স্থানীয় জেলেকে বিয়ে করার অনুমতি না থাকায় পাহাড় থেকে লাফ দিয়েছিলেন। একসময়ের দক্ষিণ গোয়ার শান্ত গ্রাম এখন গোয়ার অন্যতম বাণিজ্যিক স্থান। সেখানকার উঁচু স্থান থেকে আরব সাগরের সঙ্গে মিলিত জাউরি নদী দেখা যায়।
অ্যগোন্ডা বিচ তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক পর্যটক-সহ সূর্যস্নান, আরাম এবং সাঁতার কাটার জন্য সুন্দর জায়গা। দক্ষিণ গোয়া তার শান্ত এবং কম জনবহুল জলবায়ুর জন্য বিখ্যাত, যা রাজধানীর কোলাহল থেকে মুক্ত রাখে। যাঁরা শান্ত সৈকতে আরামদায়ক অবকাশ চান, তাঁদের জন্য দক্ষিণ গোয়া সেরা জায়গা। পালোলেম, আগোন্ডা এবং কোলভা-সহ দক্ষিণ গোয়ার সমুদ্র সৈকতগুলি বাণিজ্যিকভাবে কম উন্নত, কিন্তু সেগুলির প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ রয়েছে। সেগুলি আরাম, ট্যানিং এবং উপকূলে দীর্ঘ হাঁটা উপভোগ করার জন্য আদর্শ।
পালোলেম সমুদ্র সৈকত দক্ষিণ গোয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় সৈকতগুলির মধ্যে একটি। সৈকতটি কানাকোনার মাদগাঁও থেকে ৩৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ঘন নারকেল গাছে সজ্জিত পালোলেম সমুদ্র সৈকতে ডলফিন দেখা যায় এবং কায়াকিং অ্যাডভেঞ্চার করা যায়। এছাড়া আছে বেনোলিম বিচ, কোলভা বিচ। আর আছে বিখ্যাত দুধসাগর জলপ্রপাত।
ভারতের সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাতগুলির মধ্যে একটি। দক্ষিণ গোয়ায় দেখার মতো একটি মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। দুধসাগর জলপ্রপাতটি চারটি স্তরে বিভক্ত। পাহাড়ের নীচে দুধের স্রোতের মতো প্রবাহিত হচ্ছে জল। এছাড়া দক্ষিণ গোয়ায় আছে কয়েকটি বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী চার্চ। ব্যাসিলিকা অব বম জেসাস হল গোয়ার সবচেয়ে প্রাচীন গির্জা। ক্যাথেড্রাল গোয়ার বৃহত্তম গির্জা। চার্চ অব আওয়ার লেডি অব দ্য মাউন্ট গোয়ার সবচেয়ে সুন্দর, পুরোনো এবং বিখ্যাত চার্চগুলির মধ্যে একটি। আমরা ওই চার্চগুলি পরিদর্শন করে সেগুলির সুন্দর স্থাপত্যশৈলী এবং ঐতিহ্যের বিভিন্ন দিক দেখে সত্যিই একেবারে বিমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
গোয়ার সমুদ্রের উপরের বা সৈকতের রেস্তোরাঁর সুস্বাদু খাবার আর পানীয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। খাবার এবং পানীয়ের মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে খাবারগুলি যথেষ্ট সুস্বাদু এবং আকর্ষণীয়, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ওই ধরনের খাবার গোয়ার এক বিশেষ ও অন্যতম আকর্ষণ। ওই খাবার ও পানীয়ের স্বাদগ্রহণ করতে হলে অবশ্যই গোয়া যেতে হবে। গোয়ার আর একটি বৈশিষ্ট্য হল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দর মসৃণ রাস্তা। সেজন্য গোয়ায় গাড়িতে চড়ে যাওয়ার সময় বিশেষ ঝাঁকুনির অনুভূতি হয় না।
পরিশেষে জানাই, গোয়া হল আধুনিকতার সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদ, সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের সুন্দর মেলবন্ধন। সে কারণে গোয়া ভ্রমণ একবারে শেষ হয় না। বারবার যেতে হয় ওই সমুদ্রতটের অপার সৌন্দর্য, প্রাকৃতিক সম্পদ আর নির্মল পরিবেশ উপভোগ করার জন্য। ঐতিহ্যবাহী নির্মাণ এবং পর্তুগিজ চার্চগুলির গঠনশৈলী দেখার মতো। আর সবচেয়ে বড় কথা, গোয়ার অধিবাসীদের সুন্দর ব্যবহার এবং অতিথিদের আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা সত্যি মনে রাখার মতো।
