রবীন্দ্রনাথ রায়
কোচবিহার একটি অনিন্দ্যসুন্দর ঐতিহ্যময় শহর। শিল্প সুষমামণ্ডিত কারুকার্য সমৃদ্ধ রাজপ্রাসাদের গম্বুজটি নয়নাভিরাম রোমান অনুকরণে নির্মিত। শুধু রাজবাড়ির আয়তন ৫১,৩০৯ বর্গফুট। সামনের সুদীর্ঘ পুষ্প উদ্যান সিংহদ্বার পর্যন্ত বিস্তৃত। মোহময় সৌন্দর্য মাধুরী সুসজ্জিত সুউচ্চ সিংহদ্বারের গম্বুজ দু’টির উপরে রয়েছে ব্যাঘ্র ও সিংহের মূর্তি। তা পর্যটকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। রাজপ্রাসাদের কক্ষগুলিতে দেশি-বিদেশি সুদক্ষ শিল্পীদের হস্তনির্মিত কারুকার্য সমৃদ্ধ দৃষ্টিনন্দন স্বপ্নপুরী দেখলে মনে অনাবিল আনন্দের অনুভূতি হয়। কোচবিহার শহর হেরিটেজ সাইট ঘোষিত।
রাজবাড়ি থেকে প্রায় ৪০০ মিটার দূরে সাগরদিঘি অবস্থিত। রাজা হরেন্দ্র নারায়ণ ১৮১২ সালে প্রায় ৪১ বিঘা জমিতে এই দিঘি নির্মাণ করেন। চারদিকে লোহার রেলিং ছিল। চারটি ঘাট সুশোভিত ছিল। বর্তমানে বহু ঘাট নির্মিত হচ্ছে। লোহার রেলিং উঠিয়ে সুসজ্জিত প্রাচীরের কাজ চলছে। এখানে প্রাতর্ভ্রমণকারী বহু লোকের আগমন হয়। দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য আর মাইকে মৃদু সংগীতের সুর মন হরণ করে। সুপ্রশস্ত রাস্তা চারদিকে। দিঘির দক্ষিণ ধারে পৌরসভা ভবন, রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি, বিধানচন্দ্রের মূর্তি। পশ্চিমে জেলাশাসকের ভবন, মাইনরিটি ভবন, রাজবংশী ভাষা আকাদেমি ভবন। পূর্বে সুউচ্চ গান্ধী মূর্তি, ডিআই অফিস, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার শাখা, ট্রেজারি অফিস। উত্তরে টেলিফোন ভবন, সুউচ্চ পরিবহণ ভবন, নেতাজি সুভাষচন্দ্রের মূর্তি। এসবই দৃষ্টিনন্দন। দিঘির জলের রাজহংসী, শীতে অতিথি পাখি মনে আনন্দ আনে। আসে কবির মনে কবিতা, প্রেমিক-প্রেমিকার ঠোঁটে মৃদু মনোহরা হাসি।
সাগরদিঘি থেকে প্রায় ৪০০ মিটার পূর্বদিকে মদনমোহনের বাড়ি। কোচবিহারবাসীর প্রাণের মদনমোহনের বাড়ি রাজগুরু শঙ্কর দেব প্রতিষ্ঠিত। এই বাড়িতে রয়েছে অপূর্ব সৌন্দর্যপূর্ণ তিনটি শ্বেতদেবালয়। পূর্বে মা ভবানী, পশ্চিমে নাট ও দুর্গামন্দির। মাঝে তিনটি কক্ষ। পূর্ব কক্ষে মা অন্নপূর্ণা, মা তারা, মা কাত্যায়নী। পশ্চিমে আনন্দময়ী মা কালী। মাঝের কক্ষে ভগবান বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণ। সম্মুখে পুষ্প উদ্যান। কর্মচারীদের ভবন রাস্তাসংলগ্ন। রাস্তার ওপারে মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, ভোগ প্রদানকারীদের ভিড়। রাস্তার পাশে গাছের সারি সুশীতল ছায়াদানে রত। দক্ষিণে বৈরাগীর দিঘির নানা রঙের আলোর খেলা দেখে হৃদয়-মন বিগলিত হয়। ভক্তি সহকারে ভোগ প্রদান, জনসমাগম দেখে মন অভিভূত হয়। এ ঈশ্বরপ্রেমের এক অমোঘ নিদর্শন। সন্ধ্যায় আরতি দর্শন দেখতে বহু ভক্তের আগমন হয়। এছাড়া বিবাহ, অন্নপ্রাশন, নতুন গাড়ি ক্রয় ও বিভিন্ন শুভ কাজে আশীর্বাদ গ্রহণের জন্য ভোগ প্রদান করা হয়।
অন্য পোস্ট: ঋষি অরবিন্দকে আমরা যেন ভুলে না যাই
কোচবিহার শহর বৃত্তাকার। উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চমের রাস্তাগুলি সুপ্রশস্ত কোচবিহার রাজার সুপরিকল্পিত। শহরের ২৯টি দিঘি মৃদুমন্দ সমীরণে শহরকে সুশীতল রাখে। হেরিটেজ সাইট কোচবিহারে দেশি-বিদেশি বহু ভক্তের আগমন হয়। ঐশ্বরিক বিভূতিদর্শন হয়।
