ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে আন্দামানের সেলুলার জেল খুবই প্রাসঙ্গিক। জেলের পরতে পরতে রয়েছে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর ব্রিটিশদের অত্যাচারের ইতিহাস। যে সকল স্বাধীনতা সংগ্রামী ব্রিটিশ সরকারের কাছে ত্রাস ছিলেন, যাঁদের নিয়ন্ত্রণ করা যেত না, তাঁদের কালাপানিতে পাঠিয়ে দেওয়া হত। আন্দামান দ্বীপকে বলা হয় কালাপানি।
নির্জন দ্বীপে ইংরেজদের বর্বরতা বহুগুণ বেড়ে যেত। সেখানে অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে কিংবা হত্যা করে সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারই প্রমাণ বহন করে বর্তমানে মিউজিয়াম ঘোষণা করা সেলুলার জেল।
বহু বাঙালি বিপ্লবীর শেষ জীবন কেটেছে ওই নির্জন দ্বীপে। ভ্রমণপিপাসু বাঙালিদের কাছে সেটি এখন একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। শুধু বাঙালি নয়, প্রতিবছর দেশ-বিদেশের বহু মানুষ আন্দামান ভ্রমণে গিয়ে থাকেন।
আমরাও গত ফেব্রুয়ারিতে একসপ্তাহ কাটিয়ে এসেছি আন্দামানে। ঐতিহাসিক দুঃস্বপ্নের অনেক স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আন্দামানের সেলুলার জেল। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু বিপ্লবীর খুনে রাঙা সেলুলার জেল। আন্দামানে রয়েছে প্রাচীন প্রস্তর যুগের জাড়োয়া উপজাতি। সাধারণ মানুষের সেখানে যাওয়া কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। তবে পোর্ট ব্লেয়ার শহর থেকে বারাটাঙ্গ যাওয়ার পথের দু’পাশে গভীর জঙ্গলের ধারে রাস্তায় ধনুক হাতে দু’জন জাড়োয়া জনজাতির মানুষের দেখা মিলল। নিকষ কালো গায়ের রং, রোগা পাতলা চেহারা।
অন্য পোস্ট: বিধৌলি এখনও ঘন সবুজ
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বহু বিপ্লবীকে ইংরেজ সরকার কালাপানি পার করে আন্দামান দ্বীপে তৈরি সেলুলার জেলে পাঠিয়ে দিত। ভারতীয় বিপ্লবীদের শায়েস্তা করার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৯০৬ সালে আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ারে সেলুলার জেল তৈরি করেছিল। বিশেষ ভাবে তৈরি সাতটি তিনতলা বিল্ডিং। কেন্দ্রস্থলে ছিল একটি সুউচ্চ টাওয়ার। টাওয়ারের মাথায় একজন প্রহরী সাতটি কয়েদখানার কয়েদিদের নজর রাখতে পারত। সাতটি জেল বিল্ডিংয়র সঙ্গে একটি অস্থায়ী সিঁড়ি দিয়ে যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল। রাতে সেই সিঁড়ি সরিয়ে রাখা হত। ফলে জেলের সাতটি ব্লকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।
একটি রেপ্লিকার মাধ্যমে পুরোনো সেলুলার জেলকে তুলে ধরা হয়েছে একটি কক্ষে। ওই জেলে বিপ্লবীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হত। সেই পাশবিক চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেলুলার জেলের ভিতরে লাইট এবং সাউন্ডের মাধ্যমে। স্বাধীনতার পর সেলুলার জেলে ভারত সরকার মিউজিয়াম তৈরি করেছে। সেখানে সেলুলার জেলে যে সব বিপ্লবীকে ব্রিটিশ সরকার আন্দামানে দ্বীপান্তরে পাঠাত, তাঁদের ছবি রাখা হয়েছে ওই মিউজিয়ামে। রয়েছে বিপ্লবীদের নামের তালিকা, ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে যেখানে বিপ্লবীদের ফাঁসি দেওয়া হত, সেই ফাঁসিঘর।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের বোমারু বিমান চারটি বিল্ডিং গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। তাই এখন সেখানে তিনটি বিল্ডিং অবশিষ্ট রয়েছে। সেলুলার জেলে কয়েদিদের থাকার জন্য ৬৯৬টি ছোট ছোট সেল বা কুঠুরি ছিল। সেলগুলির তিনদিক বন্ধ। সামনে শুধু একটি লোহার গেট। সারাদিনে সেখানে হয়তো সূর্যের আলো পৌঁছত না। এভাবেই রাখা হত আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। একটার পর একটা সেল দেখতে দেখতে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রায়ই আন্দামানের সেলুলার জেলে নির্বাসনে পাঠানো হত। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন বাঙালি বিপ্লবী (৩৯৮ জন)। এরপরেই স্থান পঞ্জাবের (৯৫ জন)। এছাড়াও অন্যান্য রাজ্যের বিপ্লবীদেরও ব্রিটিশ সরকার আন্দামানের সেলুলার জেলে নির্বাসনে পাঠাত।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আর এক নতুন অধ্যায় তৈরি করেছিলেন নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসু। জাপান আন্দামান দখল করলে সেখানে তিনি প্রথম স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন পোর্ট ব্লেয়ারের জিমখানা মাঠে। আজাদ হিন্দ বাহিনীর জেনারেল এ ডি লোগানাথানকে আন্দামানের গর্ভনর নিযুক্ত করেছিলেন। তাই আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। যে সেলুলার জেলে ভারতীয় বিপ্লবীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হত, তাকে ভারত সরকার মিউজিয়ামে পরিবর্তন ও জাতীয় স্মারক ঘোষণা করেছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যাঁরা সেলুলার জেলে কাটিয়েছেন, তাঁদের ছবি সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
আন্দামানের সেলুলার জেল ঘুরতে ঘুরতে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর ব্রিটিশদের অত্যাচারের ইতিহাস মনের কোণে ভেসে ওঠে। এরকম বহু স্মৃতি বিজড়িত আন্দামান ভ্রমণ জীবনে একটি অন্যরকম মাত্রা এনে দেয়।
একসময় জাহাজ ছিল যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। এখন সাধারণত সকলেই বিমানে যাতায়াত করে থাকেন। বিমান ভাড়া জনপ্রতি আসা-যাওয়ায় ১৭,০০০ টাকা (আনুমানিক)। আন্দামান ভ্রমণে প্যাকেজ টুরই সুবিধাজনক। ছ’রাত, সাতদিনের প্যাকেজ ২১,০০০ টাকা ( বিমান ভাড়া বাদে)। ভালো হোটেল, খাওয়াদাওয়া। সাধারণত ভালো মানের হোটেল ভাড়া ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে, খাওয়াদাওয়া-সহ। খাওয়াদাওয়ায় পুরোপুরি বাঙালিয়ানা। অধিকাংশ পর্যটক বাঙালি। সেখানকার সাধারণ লোকের মধ্যেও বাঙালির সংখ্যা বেশি।

দারুন হয়েছে ❤️
অনেকে information পেলাম 🙏