অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

সেই আদিকাল থেকে বাঙালির বেড়ানোর কতকগুলি চিরাচরিত পর্যটনস্থল রয়েছে। প্রথমেই পাহাড় দেখতে দার্জিলিং, সমুদ্র দেখতে পুরী এবং দিঘা বাঙালির গতে বাঁধা। কিন্তু সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আগের তুলনায় ভ্রমণ পিপাসু মানুষের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনই নতুন নতুন পর্যটনস্থলও নিজেরাই তৈরি হয়েছে। দার্জিলিংয়ে ভ্রমণ পিপাসুরা নতুন নতুন পাহাড়ি জায়গার খোঁজে আশপাশের পাহাড়ি গ্রামে ছুটে গিয়েছেন। আগে সেসব গ্রামে থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু বর্তমানের হোম স্টে কনসেপ্ট সে সমস্যার সমাধান করেছে। এতে পাহাড়ি গ্রামের মানুষের একদিকে যেমন রোজগারের উপায় হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে যাঁরা নতুন নতুন জায়গায় যেতে চান, তাঁদের থাকা-খাওয়ারও ব্যবস্থাও হয়েছে। এমনই দু’টি পাশাপাশি পাহাড়ি গ্রাম টুংলু (Tunglu) এবং টুমলিং (Tumling)। গত অক্টোবরে আমরা বেড়িয়ে পড়েছিলাম এই সুন্দর দু’টি নয়ানিভিরাম পাহাড়ি গ্রামে।
কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার ট্রেন, বাসের অভাব নেই। যে কোনও একটিতে করে শিলিগুড়ি যাওয়া যায়। আমরা শিলিগুড়ি থেকে চারচাকা গাড়ি করে ‘মানে ভঞ্জন’-এ যাই। সেখান থেকে গাড়ি বদল করে টুংলুর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম। মানে ভঞ্জন থেকে টুংলুর রাস্তা খাড়া পাহাড়ের উপরে চলে গিয়েছে।
টুংলুর অসাধারণ নৈসর্গিক সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। প্রায় ৩০৭০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ওই মনোরম টুংলু পাহাড়ি গ্রামটি। সেখানে থাকার হোম স্টে দেখতে অসাধারণ। দূর থেকে দেখতে শঙ্কু আকৃতির। তাঁবুর মতো। শঙ্কু আকৃতির দ্বিতল। একতলায় একটি ডবল বেড এবং একটি সিঙ্গল বেড। দোতলায় একটি ডবল বেড। অর্থাৎ একটি রুমে পাঁচজন থাকতে পারে। রাতের তাপমাত্রা প্রায় ৫° সেন্টিগ্রেডে নেমে যায়। তবে থাকার ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। আপনাকেও ভালো শীতের পোশাক নিয়ে যেতে হবে। পরপর ৬টি ঘরে থাকার সুন্দর ব্যবস্থা। খাওয়াদাওয়ায় বাঙালিয়ানা রয়েছে। তবে থাকা-খাওয়া একটু ব্যয়সাপেক্ষ। আগে থেকে বুক করে যাওয়া ভালো। আমরা কোজাগরি পূর্ণিমার সময় সেখানে ছিলাম। রাতে পূর্ণিমার আলোয় পাহাড়ি গ্রামগুলির শোভা দেখার মতো।
আপনি যদি পরিবার নিয়ে একটু নির্জন পাহাড়ে সময় কাটাতে চান, তাহলে নতুন পর্যটনস্থল টুংলু এবং টুমলিংই সেরা। আমরা গত বছর ১৯ অক্টোবর সকালে সূর্যোদয় দেখতে বেরিয়ে পড়েছিলাম পাহাড়ি গ্রামে। সেখান থেকে অন্য একটি পাহাড়ি গ্রাম টুমলিং আড়াই কিলোমিটার দূরে। ১৯ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টায় বেড়িয়ে ১০টা ১০-এ টুমলিং স্টে হোমে পৌঁছেছিলাম। পাহাড়ের মেঘ, বৃষ্টি, বোদের অপূর্ব লুকোচুরি খেলা চলছিল। কখনও অন্ধকার হয়ে আসছে, আবার কখনও রৌদ্রজ্জ্বল পাহাড়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে টুমলিং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করা যায়। শুধু তাই নয়, কাঞ্চনজঙ্ঘা পাহাড়ের স্লিপিং বুদ্ধ দেখতে পারেন টুমলিং থেকে। টুমলিং অবশ্য নেপাল-ভারত সীমান্ত ঘেঁষা। সেখানে রয়েছে ছোট্ট একটি পাহাড়। ইচ্ছে হলে ট্র্যাকিংও করতে পারেন।

কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার অনেক ট্রেন এবং লাক্সারি বাস প্রতিদিন যাতায়াত করে। শিলিগুড়ি থেকে চারচাকা গাড়িতে মানে ভঞ্জন যাওয়া। মানে ভঞ্জন থেকে ৪০ মিনিটে টুংলু পৌঁছনো যায়। টুংলুয়ে রয়েছে হোম স্টে। সেখানে এক-দু’দিন নিশ্চিন্তে সময় কাটানো যায়। সেখান থেকে টুমলিং যেতে আরও চল্লিশ মিনিট।
প্যাকেজ টুর করাই ভালো। খরচ মোটামুটি জনপ্রতি চারদিনে ৮,০০০ টাকা থেকে ১০,০০০ টাকা। এর মধ্যে থাকা-খাওয়া এবং ঘুরতে যাওয়া রয়েছে।
