Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

দুর্গেশনন্দিনীর প্রেমকাহিনি ও শৈলেশ্বর-ষাঁড়েশ্বর মন্দির

শৈলেশ্বর ও ষাঁড়েশ্বর মন্দির। বাঁকুড়া।

Share Links:

শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

বিষ্ণুপুর থেকে জয়কৃষ্ণপুরের দ্বারকেশ্বর ব্রিজ পেরিয়ে ১২ কিলোমিটার এবং বাঁকুড়া থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে দ্বারকেশ্বর নদের তীরে বিষ্ণুপুর মহকুমার ডিহর গ্রাম। জয়কৃষ্ণপুর থেকে পাত্রসায়র রাস্তায় জন্তা মোড় পেরিয়ে অল্প দূরেই রাজ্য সড়কের গা ঘেঁষে ডানদিকে মন্দিরে যাওয়ার তোরণদ্বার। তোরণদ্বার পেরিয়ে সবুজ মাঠ। খানিক দূরেই বহু প্রাচীন দু’টি শিবমন্দির শৈলেশ্বর ও ষাঁড়েশ্বর।

ডিহর গ্রাম বাঁকুড়া জেলার উল্লেখযোগ্য শ্রেষ্ঠ শৈব তীর্থস্থান। দুই শিবের মন্দির বা দ্বি-হর থেকে ডিহর নামের উৎপত্তি বলে পণ্ডিতরা মনে করেন। ডিহর গ্রামের পূর্বনাম ঠাকুরপুর ছিল বলে জানা যায়। একসময় এই স্থানে বেশ কিছু ঢিপি ছিল। সেখানে খনন করে বহু শাস্ত্রগ্রন্থ পাওয়া গিয়েছে, যা বিষ্ণুপুরের আচার্য যোগেশচন্দ্র পুরাকীর্তি ভবনে সংরক্ষিত আছে।

বিষ্ণুপুর বেড়াতে এসে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বিভাগের তত্ত্বাবধানে থাকা ঐতিহাসিক মন্দিরগুলি অনায়াসেই ঘুরে নেওয়া যায়। দু’টি মন্দির রেখ-দেউল আকৃতির। মাকড়া পাথর বা ল্যাটেরাইট পাথর ও পোড়া ইটে নির্মিত ওড়িশাশৈলীর মন্দির দু’টি কে তৈরি করিয়েছিলেন, তা স্পষ্ট করে কোথাও উল্লেখ না থাকলেও অনুমান করা হয়, ১৩৪৬ সালে মল্লরাজ পৃথ্বীমল্ল এগুলি তৈরি করিয়েছিলেন। অন্য মতে, গবেষকরা বলেন, ১২০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ক্যালিকোলিথিক জনগোষ্ঠী দ্বারকেশ্বরের উত্তর তীরে বসতি শুরু করে। চতুর্দশ শতাব্দীতে এখানে শিবমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে প্রতিষ্ঠা কাল যাই হোক, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর অমর উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’-তে শৈলেশ্বর মন্দিরকে প্রসিদ্ধ করে গিয়েছেন। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাস রচিত হয় ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে। উপন্যাসের ত্রিকোণ প্রেমকাহিনির সূচনা এই শৈলেশ্বর মন্দির থেকেই। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর উপন্যাসে লিখেছেন, ‘দিল্লীশ্বরের প্রধান সেনাপতি অম্বররাজ মানসিংহের পুত্র কুমার জগৎ সিংহ বিষ্ণুপুর থেকে মান্দারণ যাত্রাকালে ঝড়ের কবলে পড়ে শৈলেশ্বর মহাদেবের মন্দিরে আশ্রয় নেন। সেখানে ঘটনাক্রমে মান্দারণ দুর্গাধিপতি জয়ধর সিংহের একমাত্র পুত্র মহারাজ বীরেন্দ্র সিংহের স্ত্রী বিমলা ও তাঁর কন্যা দুর্গেশনন্দিনী তিলোত্তমার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।‘ এরপরের ঘটনা জানতে ‘দুর্গেশনন্দিনী’ পড়তেই হবে।

এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতেই হয়। গত বছর আমার শৈশবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুজিত শীট লিভার ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে ‘দুর্গেশনন্দিনী’ পড়তে চেয়েছিল। তাঁর দুই সন্তান। বড় ছেলে আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং ছোট ছেলে রাজ্য পুলিশের কর্মী। সন্তানরা বাবার সে ইচ্ছা পূরণ করে। এরপর বন্ধুটি সন্তানদের শৈলেশ্বর মন্দির দেখিয়ে আনতে অনুরোধ করে। সন্তানরা বাবার সে ইচ্ছা পূরণ করতে গাড়ি ভাড়া করে ক্যানসার আক্রান্ত বাবাকে শৈলেশ্বর ও ষাঁড়েশ্বর মন্দির দেখিয়ে আনে। প্রিয় বন্ধুটির তখন চলৎশক্তি ছিল না। নতুন একটি হুইলচেয়ার কিনে বাবাকে তাতে বসিয়ে সন্তানরা ও বন্ধুর স্ত্রী ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শৈলেশ্বর ও ষাঁড়েশ্বর মন্দির দেখায়। বন্ধুটির কণ্ঠও তখন ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। তবুও মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আমাকে আকারে ইঙ্গিতে জানিয়েছিল, এই দেখাই তার শ্রেষ্ঠ দেখা।

পরে কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধু মারা যায়। বন্ধু মারা যেতেই আমিও ছুটে গিয়েছিলাম ডিহরের শৈলেশ্বর ও ষাঁড়েশ্বর মন্দিরে। পাশাপাশি দুটো মন্দির ছাড়াও গ্রামে রয়েছে আটচালা, কালভৈরবের থান এবং প্রচুর গাছগাছালি। পাশেই রয়েছে কচুরিপানা ভর্তি একটি জোড়খাল। মন্দিরের ভিতরে শিবলিঙ্গ, সাপ, হাতি, ঘোড়া, ত্রিশূল বিরাজ করে। প্রায় সারা বছর এখানে উৎসব-অনুষ্ঠান চলতে থাকে। গাজন, শিবরাত্রি, শ্রাবণী মেলা

ছাড়াও আরও বহু মেলা হয়। গাজনে গামির কাটা, রাজাভাটা বিখ্যাত। নিত্যপুজোর ব্যবস্থা আছে। সারা বছর নিত্যদিন বহু ভক্ত এখানে এসে মানত করেন ও পুজো দেন। ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকায় মন্দির দু’টি আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার অধীনস্থ। বর্তমানে ষাঁড়েশ্বর মন্দিরের সংস্কারের কাজ চলছে। তাই শৈলেশ্বর মন্দিরেই পুজো-অর্চনা চলছে। থাকার ব্যবস্থা নেই। খাবার ভালো হোটেল নেই। রাত কাটাতে হলে বিষ্ণুপুর সবচেয়ে ভালো জায়গা। মল্লভূম বিষ্ণুপুরে বেড়াতে গিয়ে ঘণ্টাখানেকের মতো কাটিয়ে ডিহরে ফিরে আসা যেতেই পারে। বিষ্ণুপুর থেকে অটো, টোটো, ছোট গাড়ি পাওয়া যায়। ছোট গাড়ির ভাড়া ৬০০-৭০০ টাকা। টোটোর ৩০০-৪০০ টাকা। তবে দরদাম করে নেওয়া উচিত। ষাঁড়েশ্বর ও শৈলেশ্বরে পুজোর ভোগ বা শীতলের দোকান আছে। জয়কৃষ্ণপুর মোড় থেকে পূর্বে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে অযোধ্যার বন্দ্যোপাধ্যায় বংশের জমিদার বাড়ি দেখে আসাটা উপরি পাওনা হতে পারে।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

ভ্রমণ দোঁহা ১০

ভ্রমণ দোঁহা ৯

ভ্রমণ দোঁহা ৮

ভ্রমণ দোঁহা ৭

ভ্রমণ দোঁহা ৬

ভ্রমণ দোঁহা ৫

ভ্রমণ দোঁহা ৪

ভ্রমণ দোঁহা ৩

ভ্রমণ দোঁহা ২

ভ্রমণ দোঁহা