সুদীপ ঘোষাল

আমার এক বন্ধু পক্ষিপ্রেমী। তিনি সবুজ পোশাক পরে মাঝেমধ্যে পাখি দেখে বেড়ান। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সবুজ পোশাক কেন? বন্ধু বললেন, সবুজ রংকে পাখি ভয় পায় না। কারণ ওরা তো সবুজের সন্তান। আমি ওদের কাছে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করি আর তা লিখে রাখি হৃদয়ের পাতায়। চলো আমরা চুপিচুপি পাখিরালয় ‘চুপি’ যাই।
পূর্বস্থলী কাটোয়া থেকে বেশি দূরে নয়। হাওড়া থেকে পূর্বস্থলী রেলস্টেশনে নেমে টোটোয় চাপতে হয়। টোটোয় চেপে চুপি গিয়ে দেখি খুব ভিড়। পূর্বস্থলী রেলওয়ে স্টেশনের টোটো আপনাকে পাখিরালয়ে (প্রায় ৪ কিমি) নিয়ে আসবে। সন্ধ্যা পর্যন্ত টোটো পাওয়া যায়।
বন্ধু বললেন, ভিড়ে পাখিপ্রেম জমবে না। চলো, আগে নৌকোয় চেপে হ্রদে ঘুরে আসি।
মাঝিকে বলা মাত্র নৌকো করে ঘুরিয়ে আনলেন চুপির চর। গঙ্গা নদী থেকে গঠিত লেক বা হ্রদ চুপি এবং কাষ্ঠশালীর মতো অতীতের গ্রামগুলিকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির আবাসস্থলে পরিণত করেছে। অক্সবো লেকের ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলের স্ফটিকস্বচ্ছ জল এবং আশপাশের ফলের বাগান ও কৃষিজমিতে ৭০টিরও বেশি প্রজাতির স্থানীয় এবং পরিযায়ী পাখির আশ্রয় রয়েছে। অক্সবো হ্রদটি প্রায় ৩.৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রয়েছে এবং তিনটি গ্রাম-সহ একটি দ্বীপকে ঘিরে রেখেছে। হ্রদে পাখি পর্যবেক্ষণ স্থানীয়দের নৌকোয় করা হয় এবং বোটম্যানরা অতিথিদের পাখি দেখতে সহায়তা করেন।
হ্রদটিতে গঙ্গার সঙ্গে সংযোগকারী একটি সরু চ্যানেল রয়েছে। তাই হ্রদে ঢালাও জলের একটি স্থায়ী উৎস রয়েছে। গঙ্গা অববাহিকার সমৃদ্ধ পলিমাটি এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত পূর্বস্থলী অঞ্চলকে অত্যধিক পরিমাণে সবুজে সমৃদ্ধ করেছে। তাই এখানে ভুট্টা, ধান, সরষে, পাট, আলু এবং সারা বছর বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল ও ফুলের চাষ নিয়ে কৃষিচর্চা করা হয়।
পাখি পর্যবেক্ষকদের স্বর্গ ছাড়াও পুরো পূর্বস্থলী অঞ্চলটি ইতিহাস ও ধর্মের দিক থেকেও প্রসিদ্ধ। ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে নবদ্বীপ এবং মায়াপুরের মতো শহর হয়েছে। মন্দির এবং ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। পূর্বাস্থলী ইতিহাসপ্রেমীদের কাছেও প্রিয়। কলকাতা থেকে পূর্বস্থলী যাওয়ার পথটি কালনা, হংসেশ্বরী, গুপ্তিপাড়া এবং সুখরিয়া মন্দিরের শহরগুলির মধ্য দিয়ে যায়, যা পূর্বস্থলী যাওয়ার পথকে আরও উপভোগ্য করে তোলে। এটি সমুদ্রনগর ও নতুনগ্রামের মতো টেক্সটাইল ও হস্তশিল্পের জন্য বিখ্যাত এলাকার সবুজের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মধ্য দিয়েও যায়।
সাম্প্রতিক অতীতে পূর্বস্থলী ২-এর বিডিও, স্থানীয় হিরো ক্লাব এবং কাষ্ঠশালী গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যদের যৌথ প্রচেষ্টায় লেকের পাশে পর্যটকদের থাকার বিকল্প-সহ একটি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য সমন্বিত পার্ক তৈরি করা হয়েছে৷ বর্তমানে এখানে পর্যটকদের সুবিধার জন্য চারটি নবনির্মিত লেকসাইড কটেজ, একটি আট শয্যার ডরমেটরি এবং দু’টি ডবল বেড রুম রয়েছে। একটি শিশু পার্ক এবং একটি ওয়াচ টাওয়ারও সম্প্রতি চালু হয়েছে।
এখানকার নীরবতা ভেঙে যায়, যখন চুপিচরের পালকবন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়। এই ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ অক্সবো হ্রদটি সারাবিশ্বের পাখিদের আকর্ষণ করে। আপনি ইউরেশিয়ান উইজেনস, নর্দার্ন পিনটেলস, কিংফিশার, ইন্টারমিডিয়েট এগ্রেট, স্যান্ডপাইপার, পোচার্ড এবং আরও অনেকের ঝাঁক দেখতে পারেন।
নৌকাযাত্রার খরচ প্রতি ঘণ্টায় ১৫০ টাকা। এই অক্সবো হ্রদটি এখনও গঙ্গা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত এবং এটি এখানকার জলের প্রধান উৎস। স্ফটিকস্বচ্ছ জলের নীচে আপনি বিভিন্ন ধরনের প্লাঙ্কটন এবং আগাছা দেখতে পাবেন।
ভিড় ফাঁকা হলে বন্ধু নিয়ে গেলেন চরের ধারের সবুজ বনে। সেখানে দু’টি তিতির পাখি সঙ্গমে রত। বন্ধু মুখে আঙুল দিয়ে বললেন, চুপ, চুপিচুপি গেলে ওদের কথা শোনা যায়। সত্যি, বন্ধুর সঙ্গে আমিও হারিয়ে গেলাম পাখিরালয়ের ডানার আড়ালে।
