অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

প্রতিবছর দুর্গাপুজোর দশমীতে দুর্গাপ্রতিমার বিসর্জনের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা টাকির ইছামতী নদীতে দুই বাংলার মানুষের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। একদিকে বাংলাদেশের, অন্যদিকে ভারতের দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে ইছামতী নদীতে নৌকোয় সুসজ্জিত শোভাযাত্রা হয়। তারপর নদীতে বিসর্জনের অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্য চাক্ষুষ করার জন্য নদীর উভয় পারে দুই বাংলার হাজার হাজার মানুষের জমায়েত হয়।
এছাড়া উত্তর ২৪ পরগনার টাকি এখন পর্যটনস্থলও বটে। টাকি ইছামতী নদীর ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থিত। এখানে রয়েছে ইতিহাসের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন দ্রষ্টব্য স্থান। বসিরহাট মহকুমার হাসনাবাদ থানার অধীনে টাকি পুরসভা। দুর্গাপুজোর বিসর্জন দেখা ছাড়াও সারাবছর টাকিতে মানুষ বেড়াতে আসে সপ্তাহ শেষে কিংবা দু’দিন ছুটি পেলেই, একটু অবসর কাটাতে। প্রথমেই যেটা পর্যটকদের আকর্ষণ করে, তা হল ইছামতী নদীতে নৌকো ভ্রমণ। ইছামতী নদীতে নৌকো করে মোহনার দিকে এগিয়ে গেলে তা দুটো ভাগ হয়ে বাঁদিকে কালিন্দী এবং ডানদিকে বিদ্যাধরী হয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। ইছামতী, কালিন্দী এবং বিদ্যাধরী নদীর সংযোগস্থলে বাংলাদেশের দিকে সাতক্ষীরা জেলার শিবনগর গ্রামে একটি কেওড়া গাছের বন আছে।
ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী এই টাকি। এখানকার জমিদার জগৎবন্ধু রায়চৌধুরী বাড়ির দুর্গাদালানে প্রায় ৩০০ বছরের দুর্গাপুজো এখনও অনুষ্ঠিত হয়। প্রথা অনুযায়ী এই রাজবাড়ির দুর্গাপ্রতিমা প্রথমে নিরঞ্জন হয়। তারপর অন্যান্য প্রতিমা নিরঞ্জন হয়। সেই প্রথা এখনও চলছে।
টাকির রাজবাড়ি ঘাটের পাশ দিয়ে ইছামতী নদীর পাড় ধরে কংক্রিট বাঁধানো রাস্তা চলে গিয়েছে মোহনার দিকে। রাস্তার উপর নদীর পাড়ে আমাদের আস্তানা সানরাইজ হোটেল। আরও কিছুটা এগিয়ে গেলে শ্মশান। তার সামনে দিয়ে চলে গিয়েছে মান সিং রোড। তারপর রয়েছে নদীর পারে কয়েকটি জায়গায় পিকনিক করার সুন্দর ব্যবস্থা। তার পরে রয়েছে বিএসএফ ক্যাম্প, যাদের অতন্দ্র প্রহরায় আমরা সুরক্ষিত। আছে সোনার বাংলা হোটেল এবং কটেজ।
নদীর ওপারে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শিবপুর গ্রাম। নদীর ওপারটা পূর্বদিক। সকালে সূর্যোদয়ের অপূর্ব দৃশ্য আপনাকে অভিভূত করবেই। সূর্যোদয় এবং নদীতে সূর্যের আলোর বিচ্ছুরন আপনাকে মুগ্ধ করবেই।
এখানে রয়েছে বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির। যেমন, ৩০০ বছরের পুরোনো জোড়া শিবমন্দির, কুলেশ্বরী কালীমন্দির, ঘোষদের দুর্গাদালান, শ্রীরাধা-নন্দদুলালজিউর ২২৯ বছরের প্রাচীন মন্দির। এছাড়া দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে গোলপাতার জঙ্গল, টাকি রাজবাড়ি ঘাট, প্রাক্তন সেনাপ্রধান শংকর রায়চৌধুরীর বাড়ি, টাকি রামকৃষ্ণ মিশন, ইছামতী নদী, কালিন্দী ও বিদ্যাধরী নদীর মিলনস্থল।
টাকিতে কতকগুলো উল্লেখযোগ্য সিনেমার শুটিং হয়েছে। সেই স্থানগুলো পর্যটকদের কাছে সমান জনপ্রিয়। যে বাড়িতে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সিনেমা ‘বিসর্জন’-এর শুটিং হয়েছিল, সাধারণ মানুষের কাছে তা এখন পর্যটনস্থল। এছাড়া তাপস পালের ‘আটটা আটের বনগাঁ লোকাল’-এর শুটিংও টাকিতে হয়েছিল। টাকিতে যে বাড়িতে ‘গয়নার বাক্স’-র শুটিং হয়েছিল, তার পাশেই রয়েছে প্রাক্তন সেনাপ্রধান শংকর রায়চৌধুরীর বাড়ি।
টাকিতে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে গোলপাতার জঙ্গল, যাকে মিনি সুন্দরবন বলা হয়। এখানে যেতে হলে ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র বিএসএফ চেকপোস্টে জমা দিয়ে যেতে হয়। এখানে রোপণ করা হয়েছে গোলপাতা, গেউয়া, গরান, কুদ, সাদা বাইন, কাকড়া প্রভৃতি গাছ। এখানে পর্যটকদের ঘোরার জন্য একটি কংক্রিটের রাস্তা মাটি থেকে প্রায় ১০ ফুট উচ্চতার তৈরি করা হয়েছে। আছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। এটি অনেকটা সুন্দরবনের আদলে ঘন সবুজে ঘেরা অঞ্চল। ইছামতীর তীরে তৈরি এই মিনি সুন্দরবনের সবুজ মন ভালো করে দেবে। বাংলা ১৩৩৮ সালের ১ বৈশাখ স্বর্ণলতা বসু তাঁর স্বামীর স্মৃতি রক্ষার্থে একটি গভীর নলকূপ তৈরি করে দিয়েছিলেন। যদিও এখন সেটা অকেজো, কিন্তু তা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
শ্মশানের সামনে দিয়ে চলে যাওয়া মান সিং রোডের ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, আকবরের প্রধান সেনাপতি মান সিং প্রতাপাদিত্যর বিরুদ্ধে ২২টি বাহিনী নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন। তাঁর একটি বাহিনী টাকির শ্মশানঘাটের সামনের রাস্তা দিয়ে অগ্রসর হয়েছিল বলে এই রাস্তার নাম হয়েছে মান সিং রোড। এই পরিপ্রেক্ষিতে এখানে একটি ফলক লাগানো আছে।
কখন যাবেন: দুর্গাপুজোর বিসর্জন দেখতে হলে অবশ্যই দশমীর দিনে যেতে হবে। তখন হোটেল পাওয়া সহজ হয় না, কারণ ওই সময় প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। হোটেল ভাড়াও তখন সাধারণ ভাড়ার দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে যায়। এছাড়া সারাবছরই যাওয়া যায় নৌকোবিহার করার জন্য। ইছামতী নদীতে নৌকোবিহার খুবই আনন্দ দেবে। তবে প্রচণ্ড গরমে গেলে সকাল এবং বিকেল ছাড়া বাকি সময় হোটেলেই বন্দি থাকতে হয়।
কলকাতা থেকে টাকির দূরত্ব প্রাইভেট গাড়িতে করে বাসন্তী হাইওয়ে রোড ধরে গেলে ৬৮ কিলোমিটার। দু’ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। যাঁরা ট্রেনে যেতে পছন্দ করেন, তাঁরা শিয়ালদহ থেকে হাসনাবাদ লোকালে চেপে বসুন। হাসনাবাদ স্টেশনের আগের স্টেশন টাকি রোড স্টেশন। ট্রেনেও দু’ঘণ্টা সময়ই লাগে। সেখান থেকে টোটো, রিকশা ধরে চলে যেতে পারেন আপনার পছন্দের হোটেলে।
ছোট-বড় বেশ কিছু হোটেল রয়েছে এখানে। রয়েছে টাকি পুরসভার নৃপেন্দ্রনাথ অতিথি নিবাস। এছাড়া রামকৃষ্ণ মিশনেও থাকার ব্যবস্থা আছে। হোটেল ভাড়া এসি ডবল বেডরুম ১,৫০০ টাকা প্রতিদিন। এসি ছাড়া ঘরের ভাড়া একটু কম। আপনার বাজেট পারমিট করলে সোনার বাংলা হোটেলে থাকতে পারেন। খাবারে পুরো বাঙালিয়ানা রয়েছে।
