Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

সফরনামা (শেষ পর্ব): সিকিমের অশেষ পাহাড়ি সৌন্দর্য

রাস্তার একপাশে ধাপে ধাপে উঠে গিয়েছে চা বাগান। আর একপাশে পরপর নানারকমের দোকান সাজানো— চা, মোমো। আমরা ধাপে ধাপে অনেকটা উপরে উঠে গিয়েছিলাম বাগানের মধ্যে। কী সুন্দর লাগছিল্! আর উঁচু থেকে যেহেতু অনেকটা এলাকা দেখা যায়, তাই আরও ভালো লাগছিল।

Share Links:

রিম্পা হোড়

ভিতরেও সেই একই অবস্থা, মেঘ মেঘ আর মেঘ। কয়েক হাত দূরত্বের কিছুও দেখা যাচ্ছে না। গোটা পার্কটা ঘুরে দেখতে অনেকটাই সময় লাগার কথা। কিন্তু এত মেঘ দেখে হতাশ আমি। ওই পার্কে মিউজিয়াম, শিবমন্দির, ঝরনা ও আরও অনেককিছুই ছিল। পার্কটা এমনভাবে সাজানো যে, এন্ট্রান্স থেকে কিছুটা সিঁড়ি ধরে নীচে নামতে হয়। তারপর আবার ধাপে ধাপে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়। সেই সিঁড়ির সংখ্যাও নেহাত কম নয়। আমরা বুদ্ধ স্ট্যাচুর কাছাকাছি যেতে মনে হল বিশাল আকৃতির একটি অবয়ব সামনে রয়েছে। কিন্তু কী সেটা, তা বোঝা যাচ্ছে না। ভারী মেঘ গোটা চত্বর ঢেকে রেখেছে।

আমরা ভিতরে ঢুকলাম জুতো খুলে। স্ট্যাচুর ভিতরের দেওয়াল জুড়ে রয়েছে গৌতম বুদ্ধের জীবনকাল ও তাঁর দর্শন। তাঁর জন্ম থেকে জীবনের প্রত্যেকটি পর্বের বর্ণনা। সেই সঙ্গে তা আঁকাও রয়েছে দেওয়ালে। সেই অঙ্কন শিল্প দেখে মুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকতে হয়। মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা। হ্যাঁ, তাই তো, এই গল্পটা তো ছোটবেলায় পড়েছিলাম। পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখতে অনেকটাই সময় লেগে যায়। কিন্তু তাতে কী! বাইরে বেরিয়ে দেখি, তখনও মেঘের সেখান থেকে সরে যাওয়ার কথা মনে পড়েনি। ফলে গৌতম বুদ্ধের সামনে যেভাবে পোজ দিয়ে ছবি তুলব ভেবেছিলাম, সেটাও হল না। মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। কী আর করা যায়! শুধু ঘুরে ঘুরে পার্কটি রেখে দিলাম স্মৃতিকোঠাতেই।

শেষে চলে গেলাম গৌতম বুদ্ধের দেহত্যাগের সময়কার স্ট্যাচুর কাছে। ওই চত্বরটা অনেকটাই খোলামেলা, কিছু দোকানপাট, ঝরনাও ছিল। সেখানে রাস্তায় মাঝেমধ্যে এবং পোস্টে কিছু ডেকোরেটেড আলোও ছিল। সন্ধ্যাবেলায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বুদ্ধ পার্ক সেজে ওঠে আলোর মেলায়। আমাদের হোটেলটা ছিল পার্ক থেকে হাঁটা পথে ১৫ মিনিট দূরে। হোটেলে নিজেদের ঘর দেখতে গিয়ে দেখলাম ব্যালকনির ঠিক সামনেই বুদ্ধ পার্ক। স্বাভাবিকভাবেই মন খুশ।

এবার হল আসল ট্র্যাজেডি। খাওয়াদাওয়া সেরে ব্যালকনিতে গিয়ে দেখি মেঘ পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। ঝকঝক করছে গোটা পার্ক। স্বভাবতই মন খুব খারাপ। কিন্তু তখন বেজে গিয়েছে প্রায় ছ’টা। তাই ফের সেখানে যাওয়ার উপায় ছিল না। হোটেল থেকে দেখেই ক্ষান্ত থাকতে হল। রাত হতেই প্রত্যেকটি আলো জ্বলে উঠল পার্কে। অত বড় বুদ্ধমূর্তিটা কী সুন্দর যে লাগছিল! কিন্তু দেখতে হল হোটেলের ব্যালকনি থেকেই।

ওইদিন রাতে আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ছুটি শেষ। এবার ঘরে ফিরতে হবে। তাই আমাদের মন খারাপ। পরদিন সকালে রেডি হয়ে আমরা রওনা দিলাম নামচির উদ্দেশে। প্রথমেই আমরা চলে গিয়েছিলাম টেমি টি গার্ডেনে। বিশ্বাস করুন, এত সবুজ কলকাতায় বসে জাস্ট কল্পনা করা যায় না। তবে এটাও ঠিক, কলকাতা মেট্রো সিটি আর ওটা চা বাগান। ওইদিন সিকিমে ভোট ছিল। বাগানে ঢুকতে গেলে ফি দিতে হয়। কিন্তু ওইদিন কিছুই লাগেনি। রাস্তার একপাশে ধাপে ধাপে উঠে গিয়েছে চা বাগান। আর একপাশে পরপর নানারকমের দোকান সাজানো— চা, মোমো। আমরা ধাপে ধাপে অনেকটা উপরে উঠে গিয়েছিলাম বাগানের মধ্যে। কী সুন্দর লাগছিল্! আর উঁচু থেকে যেহেতু অনেকটা এলাকা দেখা যায়, তাই আরও ভালো লাগছিল। নীচে নামতেই কিন্তু ওয়েদারের অনেকটা পরিবর্তন হয়। ঠান্ডাটা কমে গিয়েছিল বলা যায়। যাঁরা ছবি তুলতে পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য ওই বাগান একেবারে আদর্শ পয়েন্ট। ওখানে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আমরা নীচে নেমে গেলাম। চা পাতা কিনলাম বাগানের। মোমো খেলাম। ও হ্যাঁ, রাস্তার আর় একপাশে রয়েছে চা প্রসেসিংয়ের কারখানা। সেখানে আমরা অবশ্য যাইনি।

তারপর আমরা চলে যাই রোজ গার্ডেনে। এত রকমের যে গোলাপের রং হয়, আমার জানা ছিল না। কোনও একটা বেসিক রংয়ের কত রকমের শেড। গোলাপ ছাড়াও রয়েছে আরও নাম না জানা অনেকরকমের ফুল।

অন্য পোস্ট: পরকীয়ায় সত্যিই কি সুখী হওয়া যায়

সেদিন ছিল সিকিমে বিধানসভা এবং লোকসভা নির্বাচন। তাই ড্রাইভার দাদা বললেন, নামচিতে না থেকে যদি আমরা ওয়েস্ট বেঙ্গলে চলে যাই, তাহলে ভালো। আমরা আপত্তি করিনি। রওনা দিলাম বাংলার দিকে। ঠিক হল, আমরা থাকব কালিম্পঙের একটি হোমস্টেতে। ড্রাইভার দাদা খুশির খবর দিলেন, সেখান থেকেও নাকি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। আমিও ভাবলাম যে, এবারও তো কাঞ্চনজঙ্ঘার দর্শন মেলেনি। যদি ট্রিপের শেষ দিনে তার দেখা পাওয়া যায়।

আমাদের হোমস্টেতে পৌঁছতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল। হোমস্টেতে ঢোকার ঠিক মুখে যখন গাড়িটি দাঁড়াল, বাইরে থেকে একঝলক দেখেই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। আমরা যে যার রুমে ঢুকে ঝটপট ফ্রেশ হয়ে নিলাম। আগে থেকেই কথা হয়েছিল যে, সেখানে বর্নফায়ার করা হবে। এর আগে আমার বর্নফায়ারের এক্সপেরিয়েন্স ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই আমি একটু বেশি এক্সাইটেড ছিলাম। যদিও আমাদের বিশেষ কিছু করতে হয়নি। হোমস্টের এক ভদ্রলোক গোটা ব্যবস্থার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আমাদের সবকিছু সার্ভ করে দিলেন। হোমস্টের একপাশে খোলা জায়গা। তার একদিকে বর্নফায়ার, অন্যদিকে টেবিলে বসে চারজনে চলছে নানারকম গল্পের আড্ডা। ওই রাতটাও মনে থাকবে। আমরা যেখানে বসেছিলাম, তার ঠিক গা দিয়ে রাস্তা নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। খানিকটা দূরেও কিছু দেখা যাচ্ছে না অন্ধকারের জন্য। শোনা গেল, রাস্তার ওপাশে যে ঘরগুলি রয়েছে, সেগুলো নাকি হন্টেড। সেসব শুনে একবার মনে হচ্ছিল যে, আরও এসব গল্প শুনি। আবার মনে হচ্ছিল, না বাবা, থাক এখনই ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ি।

তবে যাই হোক গল্পে, কথায় রাত বাড়ল অনেকটাই। ডিনার সেরে শুয়ে পড়লাম অনেকটা মন খারাপ নিয়ে। পরদিন সকালে আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে। সেদিনই আমাদের বাড়ি ফেরার ট্রেন। ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা রওনা দিলাম গাড়ি করে। মাঝে দু’-এক জায়গায় থেমেছিলাম চা, মোমো খাওয়ার জন্য। বিকেলের একটু আগে আমরা পৌঁছলাম সেবকে। সেখানে একটি হোটেলে লাঞ্চ সারলাম। মন তখন ভীষণ খারাপ। তার দুটো কারণ। এক, ছুটি শেষ, ঘরে ফিরতে হবে, আবার সেই একঘেয়ে জীবন। দুই, ভ্যাপসা গরম। কালিম্পং থেকে নামতে নামতে বুঝতে পারছিলাম তাপমাত্রা কীভাবে বাড়ছে।

যাই হোক, খাওয়াদাওয়া সেরে আমরা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের দিকে রওনা দিলাম। আমরা অবশ্য সরাসরি স্টেশন গেলাম না। নামলাম হংকং মার্কেটে। তখন সন্ধে হব হব করছে। গোটা মার্কেট ভালো করে ঘুরে প্রচুর কেনাকাটা করা হল বাড়ির সবার জন্য। সেখানে একটি দোকান দেখে আমি প্রথমবার ফালুদা ট্রাই করলাম। তারপর টোটো করে পৌঁছে গেলাম এনজিপি স্টেশনে। বাই বাই জানালাম পাহাড়কে। কানে কানে বলে এলাম, ‘আবার আসব আমি। সেজে থেকো।’

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

ভ্রমণ দোঁহা ১০

ভ্রমণ দোঁহা ৯

ভ্রমণ দোঁহা ৮

ভ্রমণ দোঁহা ৭

ভ্রমণ দোঁহা ৬

ভ্রমণ দোঁহা ৫

ভ্রমণ দোঁহা ৪

ভ্রমণ দোঁহা ৩

ভ্রমণ দোঁহা ২

ভ্রমণ দোঁহা