ডা. সতীনাথ ভট্টাচার্য
এখন আবহাওয়াটা কেমন যেন বিদঘুটে। ভরা শ্রাবণে আকাশে রোদ আর বৃষ্টি লুকোচুরি খেলছে। কখনও গরম, আবার কখনও খানিক ঠান্ডা। এই সুযোগে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে কমন কোল্ড আর জ্বর। এখন ঘরে ঘরে জ্বর। হাসপাতালে ভিড়। সংক্রমণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না মানুষ। এই জ্বরে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ অব্যর্থ। সঠিক সিম্পটম সংগ্রহ করে ওষুধ দিলে জ্বর পালানোর পথ খুঁজে পাবে না।
এবার আমার একটি কেসের বিষয়ে জানাই। একটি বাচ্চা ছেলের ১০৪ ডিগ্রি জ্বর। আমাকে একবার যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হল। আমি দেখতে গেলাম। বাচ্চাটি ক্লাস থ্রি-তে পড়ে। চেহারা ছিপছিপে। বয়স অনুপাতে উচ্চতা মোটামুটি ঠিকই আছে।শুনলাম, বিকেল পর্যন্ত তার শরীর ঠিকই ছিল। সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই জ্বর চলে এসেছে। জ্বর আসার ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই তা পৌঁছে গিয়েছে ১০৪-এর ঘরে। বাচ্চাটি কম্বল গায়ে শুয়ে আছে। রোগী তন্দ্রাচ্ছন্ন। কপাল ভীষণ গরম। হাতের তালু, পায়ের তলা ঠান্ডা। চোখ, ঠোঁট, গালে লাল আভা। জল পিপাসা কম। কোনও অস্থিরতা নেই। প্রলাপ নেই।
প্রথমেই রোগীকে ঠান্ডা জলে পুরো স্নান করিয়ে দিতে বললাম। তারপর বেলেডোনা ২০০ প্রেসক্রাইব করলাম। বড় গ্লাসের জলে দুটো গ্লোবিউল মিশিয়ে ছোট চামচের এক চামচ করে আধ ঘণ্টা অন্তর চারবার খাওয়াতে বললাম। প্রথম ডোজ খাওয়ার পর থেকেই জ্বর কমতে আরম্ভ করল। ওষুধ চারবার খাওয়ানো শেষ হতেই জ্বর ১০০-র নীচে নেমে এসেছে। ঘণ্টাখানেক পর তা ৯৯-এরও কম হয়ে গিয়েছে। আমি বাড়ি ফিরে এসেছি। রোগীর বাড়িতে বলে এসেছি কোনও অসুবিধা হলেই ফোন করতে। আমি নিজে ভেবেই নিয়েছি যে, জ্বর আর আসবে না। বাচ্চাটি আরোগ্যলাভ করবে।
পরদিন ভোর ৪টেয় রোগীর বাড়ি থেকে আসা ফোনে ঘুম ভেঙে গেল। শুনলাম, ফের জ্বর এসেছে। ১০২ ডিগ্রিতে উঠে গিয়ৈছে। আমি নির্দ্বিধায় বেলেডোনা ২০০ আগের নিয়মে খাওয়ানোর নিদান দিলাম। সঙ্গে জলপটি দিতে বললাম। চার ডোজ ওষুধ খাওয়ানোর পরও জ্বর কমল না। ফোন এল, জ্বর ১০৩-এর উপর। ফের গেলাম রোগীর বাড়ি। ঠান্ডা জলে পুরো স্নান করিয়ে দিতে বললাম। দেখলাম, বেলেডোনার লক্ষণই বিদ্যমান। তাই ফের বেলেডোনা ২০০ আগের নিয়মেই দিতে বললাম। কিন্তু জ্বর কমার কোনও লক্ষণ নেই। আমি বাচ্চাটিকে দিয়ে একটি স্তব পাঠ করালাম। দেখলাম, স্তব পাঠ করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়ল। পুরোটা শেষ করতে পারল না।
জ্বর ফের ১০৪। মাথা ধুয়ে দিতে বললাম। জলপটি চলছে। বুঝে গিয়েছি, বেলেডোনায় আর কাজ হবে না। এত জ্বর দেখে অ্যাকোনাইট ২০০ প্রেসক্রাইব করলাম। বড় গ্লাসের জলে দুটো গ্লোবিউল মিশিয়ে ১৫ মিনিট অন্তর খাওয়াতে বললাম। ঘাম আরম্ভ হলে খাওয়ানো বন্ধ করতে হবে। সাত-আটবার ওষুধ খাওয়ানোর পরও ঘামের নামগন্ধ নেই। জ্বরের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা যাচ্ছে না। এদিকে রোগীর পরিবার আমার ওপর যথেষ্ট আস্থাশীল। এবার আমার গলদঘর্ম অবস্থা। কী করব বুঝতে পারছি না। ভাবছি, তবে কি আমি এবার মহাত্মা হ্যানিম্যানের সম্মান রক্ষা করতে পারলাম না? হোমিওপ্যাথি হেরে যাবেন? একবার চিন্তা করলাম ব্রায়োনিয়া দেওয়া যায় কি না। এসব ভাবছি। বাচ্চাটি কিন্তু তন্দ্রাচ্ছন্নই আছে। কোনও আনকমন পিকিউলিয়ার সিম্পটম পাচ্ছি না। খানিক পর হঠাৎ বাচ্চাটি দু’বার আমায় জিজ্ঞাসা করল, ‘ডাক্তারকাকু, আমার জ্বর কালকে সেরে যাবে তো?’ চমকে উঠলাম আমি। এ যে পুরোপুরি সন্দেহ! রোগীর মনে সন্দেহ কাজ করছে যে, তার জ্বর আদৌ সারবে কি না! আর একটু আগে স্তব পাঠ শেষ না করে মাঝপথেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ব্যাস, পেয়ে গেলাম আমার ব্রহ্মাস্ত্র। রোগীর একটি মানসিক লক্ষণ হাজার শারীরিক লক্ষণের উপরে। চোখ বন্ধ করে হায়োসায়ামাস ২০০ প্রেসক্রাইব করে দিলাম। বড় গ্লাসের জলে দুটো গ্লোবিউল মিশিয়ে ছোট চামচের এক চামচ করে আধঘণ্টা অন্তর চারবার খাওয়াতে বললাম। প্রথম ডোজ খাওয়ার পর থেকেই বাচ্চাটির জ্বর কমতে আরম্ভ করল। চারবার ওষুধ খাওয়ার পর জ্বর ১০০-র নীচে নামল। একঘণ্টা পর ৯৮। তারপর সারাদিন জ্বর নেই। পরদিন খবর পেলাম, বাচ্চাটি ভালো আছে। তারপর আর জ্বর আসেনি।
হোমিওপ্যাথিতে রোগীকে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখের কথা মন দিয়ে শোনা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় অ্যাকিউট বা ক্রনিক কেসে রোগী কী বলছে, কীভাবে বলছে, শুধু তা নিরীক্ষণের মাধ্যমেই ওষুধ নির্বাচন করা সম্ভব, যা হাতেকলমে দেখিয়ে দিয়েছেন ডা. সায়গল।
