প্রদীপ মারিক
সাগরদ্বীপ পৌরাণিক-ঐতিহাসিক দিক থেকে পুণ্যার্থীদের কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমন ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে প্রাণের স্পন্দন। সাগরদ্বীপে দূষণের লেশমাত্র নেই। সাগরদ্বীপের আবহাওয়া শরীর সুস্থ রাখার পক্ষে অনুকূল। অনাবিল আনন্দ নিয়ে আসে মানুষের মনে। কর্মসূত্রে অনেক মানুষ বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত হয়ে এ দ্বীপে আসেন। প্রথমে তাঁরা কিন্তু কিন্তু করলেও সকলেই মন থেকে মেনে নেন, হয়তো কোনও জন্মে পুণ্যকাজ করেছেন, তাই সাগরদ্বীপে আসতে পেরেছেন।
পৌরাণিক উপাখ্যান থেকে আমরা কমবেশি সবাই জানি, কেন মা গঙ্গা এই সাগরকেই বেছে নিলেন তাঁর পবিত্র স্রোতস্বিনী রূপকে মোহনায় বিলীন করতে। তাই গঙ্গাসাগরে কেউ যদি একবার আসেন, তিনি যদি সত্যি অন্তর থেকে প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, তাহলে তাঁকে অন্তত একসপ্তাহ থেকে যেতে হবে। মনে হবে না, মোবাইল ফোন, টিভি দেখি। ইচ্ছা হবে শুধু চেয়ে থাকি অনাবিল প্রকৃতির দিকে। কী সৌন্দর্য, অপরূপ মেঘবালিকার দল! কেউ যদি একটি রাত এই প্রকৃতির নির্জনতায় চোখ বোজেন, তাঁর ঘুম আসবেই, এটা নিশ্চিত।
কাকদ্বীপ হয়ে লট নম্বর ৮, ভেসেল ঘাট। জোয়ার থাকলে ১৫-৩০ মিনিট অন্তর ভেসেল। একবার চড়লে মনে হয়, আবার চড়ি। ভেসেলে চড়লে মুড়িগঙ্গার প্রবল স্রোত অতিক্রম করেও স্রোত বোঝা যায় না। মনে হয়, যেন ট্রেনে চড়েছি। হেলছে না, দুলছে না। ভেসেলে বসে বহু দ্বীপ নজর আসে। কত ভাবনা মাথায় আসে! ওই দ্বীপে কি কেউ বাস করে? কী রূপ, যেন কোনও শিল্পী ছবি এঁকে রেখেছেন!
ভেসেল এসে কচুবেড়িয়া ঘাটে ভেড়ায়। ভেসেলে ওঠা সব যাত্রীই নেমে পড়েন। অসুস্থ, বয়স্ক মানুষকে ভেসেল থেকে নামানোর জন্য ছুটে আসেন কর্তব্যরত পুলিশকর্মী এবং ভেসেল ঘাটের কর্মীরা। বহু বাস, টোটো, অটো দাঁড়িয়ে আছে। যে কোনওটায় উঠে পড়লেই গঙ্গাসাগর। ৩০ কিলোমিটার পথ। কিন্তু পৌঁছতে সময় লাগে ১ ঘণ্টা। একেবারে তেলের মতো রাস্তা। মাঝেমধ্যে স্পিড ব্রেকার। কচুবেড়িয়া থেকে ১৬ কিলোমিটার পথ গেলেই রুদ্রনগর। সময় ৩০ মিনিট। এখানে একটু রেস্ট নিয়ে চা খেয়ে নিলে কেমন হয়? ছবি টি স্টল। অপূর্ব চা। একচুমুক চা খেলেই যেন রাস্তায় আসার সব ক্লান্তি কোথায় উবে যায়। চা খেতে খেতে একবার মোবাইল ফোন দেখে নেওয়া যাক। কী তাজ্জব ব্যাপার! 5G নেটওয়ার্ক! এমন সুন্দর নেটওয়ার্ক তো বড় শহরেও নেই! এ কথা ভাবতে ভাবতেই চায়ের গ্লাস শেষ। দীপকের হাতে তৈরি চা যেন ছোটগল্প হয়েই রইল। একটা চা খেলাম বটে!
ফের যাত্রা শুরু। সাগরদ্বীপ স্বচ্ছতার নিশান। কোনও জায়গায় পলিথিন পেপার পড়ে নেই। যদিও বা দু’-একটি পড়ে থাকে, সাগরদ্বীপের মানুষরা নিজেরাই তা তুলে কোনও বাদায় গিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছেন। এত সচেতন সাগরদ্বীপবাসী, যেন পুরো দ্বীপটাকে এখানকার মানুষ নিজের গোবর নিকোনো উঠোন মনে করেন। গঙ্গাসাগর কপিল মুনি আশ্রম ঘুরে এসে যদি সাগরদ্বীপের মুড়িগঙ্গা, চৌরঙ্গী, বাগবাজার, চেমাগুড়ি, হরিনবাড়ি, চিত্তমোড়, পয়লা ঘেরি, কচুবেড়িয়া আশ্রম মোড়, বামনখালি কিংবা রুদ্রনগরে কিছু দিন থাকা যায়, তাহলে প্রাকৃতির অপরূপ রূপ দর্শন করা সম্ভব হবে।

