সাগরময় অধিকারী

বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, বয়স রবীন্দ্রনাথকে ক্রমশ সুন্দরতর করেছে। তাঁর মতো মনটাও যেন বয়সের সঙ্গে ক্রমশ সরস হয়ে উঠেছিল।
রবীন্দ্রনাথের সংলাপের ভাষা ছিল পরিশীলিত। জীবনে তিনি কোনও স্থূল রসিকতা বা অমার্জিত শব্দ ব্যবহার করেননি। আলাপের মধ্যে রসিকতার বিন্দুমাত্র সুযোগ পেলে তিনি তার চূড়ান্ত সদ্ব্যবহার করতেন। এ বিষয়ে বনমালী বা মহাত্মা গান্ধী, কাউকে তিনি ছাড়েননি। কারও স্বভাবে, কথায় বা কাজে হাসির খোরাক পেলে তিনি তা নিয়ে রঙ্গ করেছেন, কিন্তু তাতে অনাবিল হাসির প্রস্রবণ ধারা বয়ে যেত। কাউকে কখনও দুঃখ দিতেন না। সদানন্দময়, সদালাপী রসিক ব্যক্তিরাই তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ। কবির সঙ্গে আলাপরত অবস্থায় যেসব অন্তরঙ্গ মানুষ তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন প্রাণ খুলে, সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে, তিনি যেন তাঁদের আরও আপনজন হয়ে উঠতেন। সকল স্তরের মানুষের প্রতি কবির কৌতুকপরায়ণ স্নেহসিক্ত আলাপের অসংখ্য নমুনা বিভিন্ন বিশিষ্ট লেখকের গ্রন্থে ছড়িয়ে আছে। সেসব গ্রন্থে এমন একজন ব্যক্তির ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যাঁর রঙ্গপ্রিয়তা শুচি ও রুচির সমন্বয়ে যেন এক অসাধারণ শিল্প হয়ে উঠেছে।এরকম বহু নমুনার কয়েকটি উল্লেখ করছি।
১
মস্কোয় পৌঁছনোর চারদিন আগে বার্লিন থেকে দিগেন্দ্রনাথের স্ত্রী কমলা দেবীকে একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘এদেশে বর্ষণ যথেষ্টর চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু তার মধ্যে হর্ষণের আভাস লেশমাত্র পাইনে। হৃদয় ময়ূরের মতো নাচে না। ভিজে কাকের মতো অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে থাকে।’
হেমবালা সেনকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে এই সুর যেন আরও সরস, আরও আন্তরিক। শ্রাবণের মাঝামাঝি তিনি লিখেছিলেন, ‘মনে করলে মন খারাপ হয়ে যায়, আমি নেই, অথচ আশ্রমে বর্ষা ঋতু যথানিয়মে দেখা দিচ্ছে। এটা কী করে সম্ভব হয়, আমি তো বুঝতে পারিনে।’ ওই চিঠিতে কবি আরও লিখেছিলেন, ‘এখানে মেঘ-বৃষ্টির অভাব নেই। কিন্তু এই ম্লেচ্ছদের দেশে আষাঢ়-শ্রাবণ কোথা থেকে পাওয়া যাবে? বৃষ্টি পড়ে, কিন্তু হৃদয় আমার ময়ূরের মতো নাচে না, ভিজে কাকের মতো পাখার মধ্যে মাথা গুঁজে থাকে।’
২
একবার সুরুল কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ যখন মেঝেয় বসে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন, তখন গান্ধীজি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য গেলেন। রবীন্দ্রনাথের পাতে লুচি ছিল। গান্ধীজির তখন সৃষ্টিছাড়া খাওয়াদাওয়া। ভাত নয়, রুটি নয়, কেবল বাদাম খেয়ে বেঁচে ছিলেন। রাতের খাওয়া শেষ করতেন সূর্যাস্তের আগে। রবীন্দ্রনাথ লুচি খাচ্ছেন দেখে গান্ধীজি উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে উঠলেন, ‘এ কী! আপনি সাদা ময়দার লুচি খাচ্ছেন! এ যে বিষ!’ কিন্তু যাঁর জন্য জাতির জনকের উৎকণ্ঠা, তিনি হাসতে হাসতে ওই বিপজ্জনক লুচির একটুকরো গালে দিয়ে বললেন, ‘বাট মিস্টার গান্ধী, ইট ইজ আ ভেরি স্লো পয়জন।’
৩
রবীন্দ্রনাথ জীবনে প্রথম বিদেশে যান ব্যারিস্টারি পড়তে। দুঃসহ আঠারো বছর নিয়ে সেই তাঁর প্রথম বিলেত প্রবাস। কখনও লন্ডন, কখনও ব্রাইটন, কখনও টার্কি। আদিম অরণ্যের ছায়ায় ঘুরে বেড়ানো অদ্ভুত মূর্তির আবেগ নিয়ে তিনি মিশলেন ইংল্যান্ডের কেতাদুরস্ত সমাজে। যদিও তিনি নিজে ‘লেডি জাত’-কে বড্ড ডরাতেন, তবু তখন একের পর এক ইংরেজ তরুণীর বাহুলগ্ন হয়ে যোগ দিতে লাগলেন নাচের আসরে। বিলেতি গান গেয়েও তিনি মাতালেন বহু গুণমুগ্ধ রূপবতীকে। নাচ-গানের ক্ষমতা, ভুবনমোহন রূপ, আর ছিল প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে ব্যয় করার মতো প্রচুর অর্থ। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাতি তো! কিন্তু তিনি যে তখন কারও গোপন প্রেমে বাঁধা পড়েননি, সে সম্পর্কে পরিণত বয়সে দিলীপকুমার রায়কে বলেছিলেন, ‘দুঃখের কথা বলব কী, আমার এই চেহারাটা যে নেহাত অচল নয়, এ কথা আমি প্রথম টের পাই কোথায় জানো? বিলেতে। এতই লাজুক আর মুখচোরা ছিলাম সে সময় যে, তরুণীমহলে এরকম প্রতিষ্ঠার কানাঘুষো শুনেও ওদিকে ভিড়তে সাহস পাইনি। আসলে আমার বয়স হয়েছিল দেরিতে।’
৪
শান্তিনিকেতনে একদিন জমজমাট আড্ডা চলছে। ঘরে অনেক লোক বসে আছেন। রবীন্দ্রনাথের তলব পেয়ে নেপাল রায় দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে তাঁর কাছে গিয়ে উপস্থিত হলেন। কবি তাঁর দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘নেপালবাবু, আজকাল আপনার বড় ভুলচুক হচ্ছে। এ ভালো নয়। আপনাকে দণ্ড পেতে হবে।’ এই বলে তিনি ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
নেপালবাবু শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক। ভাবনায় অস্থির হলেন। তাঁর কাজে এমন কী ভুল হল, যার জন্য গুরুদেব তাঁকে এমন ভাবে বললেন! উপস্থিত সকলের মনেও উৎকণ্ঠা। এমন সময় রবীন্দ্রনাথ একটি লাঠি হাতে করে ঘরে ঢুকলেন। লাঠিটি নেপালবাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই হল আপনার দণ্ড। কাল আপনি ভুলে ফেলে গিয়েছেন।‘ তখন নেপালবাবু এবং সকলের মুখে হাসি ফুটল।
৫
রবীন্দ্রনাথ এক বন্ধুর বাড়িতে নিমন্ত্রণে গিয়েছেন। বন্ধু ভাবছেন, এত বড় মানী লোক বাড়িতে পা দিয়েছেন, কী করে অভ্যর্থনা করবেন। যথাযোগ্য সমাদর করে একখানি সুন্দর চেয়ার এগিয়ে দিলেন। রবীন্দ্রনাথ চেয়ারটি দেখে বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘চেয়ারটি সজীব নয় তো?’ রবীন্দ্রনাথের ওই গুরুগম্ভীর প্রশ্নে ভদ্রলোক বিস্মিত হলেন। চেয়ার তো জড় পদার্থ, সজীব হবে কী করে! তিনি রবীন্দ্রনাথের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। তখন বন্ধুর বিব্রত ভাব দেখে রবীন্দ্রনাথ হাসতে হাসতে বললেন, ‘ওহে, তোমার ভাবনার কিছু নেই। আমি বলছি, চেয়ারটি স-জীব নয় তো, অর্থাৎ ওতে ছারপোকা নেই তো?’ বন্ধুটি এ কথা শুনে ধাতস্থ হলেন।
৬
এক গানের আসর। বিখ্যাত গায়ক গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় গান গাইবেন। রবীন্দ্রনাথ সেই আসরে উপস্থিত। গোপেশ্বরবাবুর গান হয়ে যাওয়ার পর ভক্তরা রবীন্দ্রনাথকে বললেন, একখানা গান গাইতে হবে। রবীন্দ্রনাথ তা শুনে হেসে বললেন, ‘গোপেশ্বরের পর এবার কি দাড়ীশ্বরের পালা?’

